July 30, 2009

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজও বাংলাদেশের

জয়ের পিঠে জয়। তা-ও প্রতিপক্ষের মাটিতে। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে এমন নজির আর নেই। দেশের ২০০তম ওয়ানডে ম্যাচটি স্মরণে রাখার মতো করেই জয় করেছে বাংলাদেশের তারুণ্য উদ্দীপ্ত ক্রিকেটাররা। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম দু' আসরের চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সিরিজ নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। টস জিতে স্বাগতিক ওয়েস্ট ইন্ডিজ যখন ৫০ ওভারে ২৭৫ রানের টার্গেট ছুড়ে দেয় তখন একটা সংশয় বেশ জোরালোই ছিল। এত রান তাড়া করে জয়ের কোন নজির বাংলাদেশের রেকর্ড বুকে ছিল না। এর আগে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৫০ রান তাড়া করে জয়ের ঘটনাটিই ছিল বাংলাদেশের জন্য রেকর্ড। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের নবগঠিত দলের ক্রিকেটাররা বাংলাদেশের নজির-গড়া জয়ে বাধা হতে পারেনি। সাবেক ও বর্তমান অধিনায়ক যদি ফর্মে থাকে তখন কঠিন লক্ষ্যও যে সহজ হয়ে যায় তার প্রমাণ মিললো ফের। সাবেক অধিনায়ক আশরাফুল আর বর্তমান অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের টানা দু' অর্ধশতকে বাংলাদেশ ৬ বল বাকি থাকতেই টানা দ্বিতীয় জয় পায়। দেশ ও দেশের বাইরে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের এটি নবম ওয়ানডে সিরিজ জয়। আর দেশের বাইরে তৃতীয় সিরিজ জয়। টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে জিম্বাবুয়ের পর এটিই দ্বিতীয় কোন দেশের বিপক্ষে জয়। প্রথম ম্যাচের মতো দ্বিতীয়টিতেও সংযমী ছিলেন আশরাফুল আর সাকিব ছিলেন তুলনামূলক আগ্রাসী। টেস্ট ম্যাচে ব্যর্থতার পর প্রথম ম্যাচে ৫৭ রান করার পর মঙ্গলবার ৬৪ রান করেন আশরাফুল। আরেকটু সংযমী হলে ১৮তম ফিফটিটিকে সেঞ্চুরিতেও পরিণত করতে পারতেন তিনি। কিন্তু লুইসের বলে ছক্কা হাঁকাতে গিয়ে লং অফে ক্যাচ তুলে দেন রিচার্ডস-এর হাতে। বাংলাদেশ দল যদি হেরে যেতো তবে সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পেতেন না তিনি। কারণ বাংলাদেশ দল তখনও ৮৫ রান দূরে যখন তিনি আউট হন। ২০০৬ সালের পর এই প্রথম আশরাফুল পরপর দু' ম্যাচে ফিফটি পেলেন। ৭৭ বলের ইনিংসে আউট হওয়ার আগে মাত্র ৩টি চার ও ১টি ছক্কা হাঁকালেও ব্যাটিংয়ে বেশ সাবলীল ছিলেন। একাদশ ওভারে ওপেনার তামিম স্বভাব বিরুদ্ধ (৪১ বলে ২৯, ৪৩) ইনিংস খেলে আউট হলে মাঠে নামেন আশরাফুল। দলের স্কোর ৪৬। এর ১৮ রান পর ৩৩ বলে ২৩ করে আউট হন জুনায়েদ। এরপর তৃতীয় উইকেটে আশরাফুল-রকিবুল ৭২ বলে ৫২ রান যোগ করেন। তখনও হাত খোলেননি সাবেক অধিনায়ক। ২৮তম ওভারে এসে বার্নার্ডের বলে প্রথম চার মারেন ৭০ বল খেলা আশরাফুল। রকিবুলের বিদায়ের পর চতুর্থ উইকেটে আশরাফুল-সাকিব ৭৪ রান যোগ করে ক্যারিবীয়দের ম্যাচে ফেরার রাস্তা কঠিন করে দেন। বাউন্ডারি তেমন না এলেও ৭৪ রান ওঠে ৬৩ বলে। পিচ স্েলা হয়ে যাওয়ায় বলকে সীমানার বাইরে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। ২৩৮ রানের মাথায় সাকিব ৬১ বলে ৬৫ রান করেন। প্রথম ম্যাচে ৫৪ রান করা সাকিবের এটি ৬৪ ম্যাচে দ্বাদশ হাফ সেঞ্চুরি। এক-দু' রান করেই এগোন সাকিব। মাত্র ২টি চার ও ১টি ছক্কা হাঁকাতে পারেন তিনি। তারপরও স্ট্রাইক রেট ১০০ ভাগের বেশি রাখেন তিনি। শেষ ১০ ওভারে বাংলাদেশের টার্গেট দাঁড়ায় ৭১ রান। স্বাগতিকরা শেষ ১০ ওভারে তুলেছিল ৯৮ রান। উইকেটও বাংলাদেশের সমান ছিল। ওই সময় লুইসের বল হাঁকিয়ে আউট হতে যাচ্ছিলেন সাকিব। বল উঠে যায় লংঅফে। ক্যাচ ধরতে ছুটে আসেন বার্নার্ড ও সামি। দু'জনের সংঘর্ষে বলে পড়ে যায় মাটিতে। ৪৮ বলে যখন প্রয়োজন ৫৬ রান তখন পাওয়ার-প্ল্লে নেন সাকিব। কেমার রোচকে বল দেন রেইফার। আউট সাইডে ৫ ফিল্ডার রেখে রোচ হাফভলি বল দেন সাকিবকে। সুযোগটা হারাননি সাকিব। বল পাঠিয়ে দেন সীমানার বাইরে। পরেরটি আসে ফুলটস। সেটিও সীমানা পার করান সাকিব। পরের বলটি দেন কাঁধ সমান উঁচুতে। এবার আর গড়িয়ে নয়, উড়িয়ে সীমানার বাইরে (ছক্কা) পাঠান সাকিব। ওই বিমার দিয়ে বহিষ্কৃত হন রোচ। তার ওভারটি করেন উইকেটরক্ষক থমাস। ৪৪তম ওভারে সামির প্রথম বলেই রিচার্ডস-এর হাতে ধরা পড়েন আক্রমণাত্মক সাকিব। ৩৫ বলে দরকার তখন ৩৭ রান। টার্গেটটা সহজই ছিল। মুশফিক তখন বেশ ছন্দে। কিন্তু রিয়াদ ৫ বলে ৩ রান করে বিদায় নিলে শঙ্কা জাগে। ২৪ বলে দরকার ২৪। টমাসের করা ৪৬তম ওভারের শেষ বলে ৩০ বলে ৩১ রান করে মুশফিক আউট হলে ক্যারিবীয় শিবির খানিকটা চাঙ্গা হয়। কিন্তু ১৮ বলে ১৪ রানের পথকে আর কঠিন হতে দেননি স্পিনার রাজ্জাক। শেষ দিকে রোচের বিকল্প বোলার না থাকায় খেসারত দিতে হয় ক্যারিবীয়দের। ওই সময় হতাশায় খেই হারিয়ে ফেলেন তারা। রাজ্জাক ১০ বলে ১১ রান করলে ৬ বল বাকি থাকতেই বাংলাদেশ জয়ের লক্ষ্যে পেঁৗছে যায়। অনেকদিন পর বাংলাদেশ দলের শীর্ষ ৬ ব্যাটসম্যানই দু' অঙ্কের রান করেন। তবে ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরাও মন্দ করেননি। তাদেরও ক্যাপ্টেন ছাড়া অন্যরা ভালই করেন। ডাওলিন টেস্টের মতো ওয়ানডেতেও দারুণ খেলে প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরিও করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য ব্যর্থ হয়ে যায় শতরানটি। ৮৮ বলে ৫০ করা এ ব্যাটসম্যান ১০০ রান করেন ১১৬ বলে। ৪০ ওভারে ১৭৫ রান করা ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ ১০ ওভারে ৯৮ রান তুলে বাংলাদেশ শিবিরে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। নাঈম ও সাকিব ছাড়া অন্য বোলাররা তেমন সমীহ আদায় করতে পারেননি। দু'টি রান আউট বোলারদের বোঝা খানিকটা লাঘব করে দেয়। সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচটি সেন্ট কিটসে হবে আগামীকাল। ওই ম্যাচটি জিতলে শতভাগ জয় নিয়ে প্রথমবারের মতো দেশে ফিরতে পারবেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।

July 26, 2009

টিপাইমুখ বাঁধ তৈরির সব প্রস্তুতি সম্পন্ন, কেবিনেট কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষা

পরিতোষ পাল, কলকাতা থেকে: টিপাইমুখে বাঁধ তৈরির ব্যাপারে প্রথম থেকেই ভারত সরকার গোপনীয়তা নিয়ে চলেছে। বাঁধ নির্মাণের ব্যাপারে বারবার সরকারি স্তরেই আপত্তি উঠেছে। পরিবেশ দপ্তরের অনাপত্তিপত্র বা ছাড়পত্র পেতে প্রকল্প কর্তৃপক্ষকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। ভারত সরকারের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের এক্সপার্ট অ্যাপ্রাইজাল কমিটি প্রথম দফায় আবেদনপত্র ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল নানা অসঙ্গতি তুলে ধরে। পরে অবশ্য তারা পরিবেশগত ছাড়পত্র দেয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছে বলে জানা গেছে। টিপাইমুখে বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা যে সেই ১৯৭১ সাল থেকে চলছে তা ভারতের হাইকমিশনার পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী নিজেই ঢাকায় এক সেমিনারে জানিয়েছেন। তবে প্রথম দিকে আসামের কাছাড় এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য নিয়ে টিপাইমুখে বাঁধ তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। পরে এটিকে বহুমুখী জলবিদু্যৎ উৎপাদন প্রকল্পে রূপান্তরিত করা হয়। বলা হয়, ১৫০০ মেগাওয়াট বিদু্যৎ উৎপাদন করা হবে। আর এই বিদু্যৎ আসামকে যেমন আলোকিত করবে তেমনি বাংলাদেশকেও দেয়া হবে। তবে সরকারি সূত্রেই জানানো হয়েছে, ১৫০০ মেগাওয়াটের কথা বলা হলেও আসলে তৈরি হবে মাত্র ৪২৫ মেগাওয়াট বিদু্যৎ। কিন্তু এই প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি কখনওই। অথচ এই তথ্য জানার দাবি জানানো হয়েছে বহুবার। এমনকি যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে এই প্রকল্প তৈরি করা হবে তার ভায়েবিলিটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিভিন্ন সংগঠন। অবশ্য এই প্রকল্প তৈরির ব্যাপারে অস্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রথম থেকেই। ভারত সরকার এই প্রকল্প তৈরির দায়িত্ব দেয় সরকারি সংস্থা নর্থ ইস্টার্ন ইলেকট্রিক পাওয়ার করপোরেশন লিমিটেড বা নিপকো-কে। তবে মণিপুরের মানুষের প্রতিবাদের মুখে সরকার খানিকটা থমকে যায়। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ১৯৯৭ সালে ভারত সরকার আবার টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করে। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরালের আমলে সরকার প্রকল্পটি অনুমোদন করে। ২০০১ সালে মণিপুর সরকারের সঙ্গে নিপকো এক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে মণিপুর সরকারকে এর সঙ্গে জুড়ে নেয়। তবে তখন মণিপুরে রাষ্ট্রপতি শাসন চলতে থাকায় পরবর্তীকালে অর্থাৎ ২০০৩ সালের নির্বাচিত মণিপুর সরকার সেই স্মারক অনুমোদন করে। আর তারপর থেকেই বাঁধ তৈরির প্রস্তুতি শুরু হয় দ্রুত তালে। সমস্ত জনমত উপেক্ষা করে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারত সরকার ২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করে। ওই বছরেই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-র এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার কথা থাকলেও তা রহস্যজনক কারণে বাতিল হয়ে যায়। আর তারপর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র পাওয়ার আগেই একরকম চুপিসারে ২০০৬ সালের ২রা ডিসেম্বর ভারতের তৎকালীন বিদু্যৎমন্ত্রী সুশীল কুমার শিন্ধে ভারি শিল্পমন্ত্রী সন্তোষ মোহন দেবকে সঙ্গী করে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এমনকি টিপাইমুখে ড্রিলিং ও অন্যান্য কাজও শুরু করে দেয়া হয়েছিল কড়া নিরাপত্তায়। কিন্তু আন্দোলনকারী স্থানীয় জনগণ প্রকল্প এলাকায় ঢুকে সব যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করার ফলে কাজ বন্ধ করে দেয়া হয়। অথচ ভারত সরকার এই পর্যায়েও বাংলাদেশ সরকারকে প্রকল্পের ব্যাপারে কোনভাবে অবহিত করেনি বলে জানা গেছে। কিন্তু ২০০৫ সালে ভারতের তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রী ও যৌথ নদী কমিশনের যৌথ চেয়ারপারসন প্রিয়রঞ্জন দাশ মুন্সী পরিষ্কারভাবে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনা না করে কোন নদী প্রকল্পের কাজে ভারত হাত দেবে না। কিন্তু মন্ত্রীর সেই আশ্বাস রক্ষা করা হয়নি বলে অভিযোগ। তবে প্রকল্প নিয়ে ২০০৫ সালের নভেম্ব্বরে যেসব প্রশ্ন তুলে এক্সপার্ট অ্যাপ্রাইজাল কমিটি নিপকো'র আবেদন ফেরত পাঠিয়েছিল সেগুলো ছিল গুরুতর। অ্যাকশন কমিটি এগেনস্ট টিপাইমুখ ড্যাম-এর জনৈক মুখপাত্র জানান, কোন রকম পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা বা পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহ না করেই বাঁধ তৈরির জন্য ছাড়পত্র চাওয়া হয়েছিল। তিনি আরও জানান, ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেও ফের আবেদন ফেরত পাঠানো হয় নানা অসম্পূর্ণতার জন্য। তবে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর অফিসের চাপেই নাকি কিছুদিন আগে সেই ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারী নেতারা। মণিপুরের পরিবেশ দপ্তরও দ্বিধা কাটিয়ে ছাড়পত্র দিয়েছে সমপ্রতি। এখন গোটা প্রকল্পটি পাঠানো হয়েছে ভারত সরকারের অর্থনৈতিক বিষয়ক কেবিনেট কমিটির কাছে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য। আর সেই অনুমোদন পেলেই পুরোদমে কাজ শুরু হয়ে যাবে বাঁধ তৈরির। ৮৭ মাসের মধ্যেই তৈরি করা হবে এই প্রকল্প। তবে দিলি্লর একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার আগে সরকার বিষয়টি কেবিনেট কমিটিতে আলোচনায় রাখতে চাইছে না। বাংলাদেশের সঙ্গে টিপাইমুখ ইসু্যতে যাতে কূটনৈতিক সম্পর্ক জটিল আকার ধারণ না করে সেজন্য ভারত সরকার সতর্কভাবে এগোতে চাইছে। আর তাই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং সমপ্রতি শেখ হাসিনাকে এ ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন।

July 22, 2009

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়

অভাবনীয় ও ঐতিহাসিক জয়। প্রথমে টেস্ট, পরে সিরিজ। বিদেশের মাটিতে একই সফরে দু'টি জয়ের ষোলকলা পূর্ণ করে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। সোমবার রাতে গ্রেনাডায় সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টে ৪ উইকেটে পরাস্ত করে এক সময়ের বিশ্বসেরা ক্রিকেট দল ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। দেশের বাইরে প্রথম সিরিজ জয়ই নয় কেবল, কোন দেশের বিরুদ্ধে পর পর দু'টেস্টে জয়ের কৃতিত্বও এই প্রথম। ২০০০ সালে টেস্ট পরিবারের সদস্য হওয়ার পর থেকেই সংগ্রামের শুরু। কুলীন শ্রেণীর দলগুলোর কাছে একের পর এক সিরিজ পরাজয়ে বহুবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস। অনেক দেশ এখন আর বাংলাদেশকে টেস্ট খেলতে আমন্ত্রণ জানাতে চায় না। ব্যর্থতার ধারা অব্যাহত থাকায় বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থা আইসিসিও ভাবছে দু'টি ভাগে বিভক্ত করে বাংলাদেশের টেস্ট পরিধি ছোট করে দেয়ার কথা। এমনি সময় এলো কাঙ্ক্ষিত সেই জয়। না, বিচ্ছিন্ন একটি ম্যাচ জয় নয়। ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইতিহাসের প্রথমটা পাওয়ার পর বিজয়ের অনুভূতি ভুলতেই বসেছিল বাংলাদেশ। দীর্ঘ সাড়ে চার বছর পর সেই অনুভূতির দেখা মেলে গত সপ্তাহে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেন্ট ভিনসেন্ট দ্বীপে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে সেই ম্যাচে ৯৫ রানে হারিয়ে আক্ষেপ দূর করে বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে যা আসে দ্বিতীয়বারের মতো। আর বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো বিজয়ী বেশে বাংলাদেশ। সেই জয়ের পর থেকেই দম বন্ধ করে অপেক্ষার শুরু। ইতিহাসে দ্বিতীয় সিরিজটা জিততে পারবে তো বাংলাদেশ? একরাশ শঙ্কা নিয়ে গ্রেনাডায় খেলতে নামে বাংলাদেশ- দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ক্রিকেটার অধিনায়ক মাশরাফীকে ছাড়াই।

নেতৃত্বের অভিজ্ঞতাহীন সাকিব আল হাসানের কাঁধে ভর করে শুরু হয় লড়াই। প্রথম টেস্ট জিতে থাকায় অনেকেই আশায় ছিলেন গ্রেনাডা টেস্ট অন্ততপক্ষে ড্র করুক বাংলাদেশ। ক্রিকেট যারা বোঝেন না, কিংবা কালেভদ্রেও যারা ক্রিকেটের খোঁজ রাখেন না তারাও হাজার মাইল দূরে খেলতে নামা বাংলাদেশ দলের জন্য প্রার্থনা করেছেন। শেষ পর্যন্ত সব অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। না, অতীতের মতো কোন আক্ষেপ দিয়ে নয়। কাঙ্ক্ষিত সিরিজটা জিতেছে বাংলাদেশই। ড্র করে নয়, বীরের মতো ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৪ উইকেটে হারিয়ে। যার ওপর হঠাৎ করেই এসে পড়েছিল দলের দায়িত্ব সেই সাকিব আল হাসান বলতে গেলে একাই বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্যটি এনে দিয়েছেন। প্রথম ইনিংসে দু'দলের ব্যবধান মাত্র ৫ রান হওয়ায় এক ইনিংসে পরিণত হওয়া ম্যাচে প্রথমে বল হাতে ৫ উইকেট শিকারের পর ব্যাট হাতে খেলেন ৯৭ বলে ৯৬ রানের ম্যাচ জয়ী ইনিংস। তার ইতিহাস গড়া ওই পারফরমেন্স ম্লান করে দেয় ড্যারেন সামির রুদ্রমূর্তি হয়ে ওঠাকে। একাই ৫ উইকেট নিয়ে রীতিমতো ভীতি ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সামি। কিন্তু সাকিবের কাছে অন্যদের মতো সামিও ম্লান হয়েছেন। এ কারণে দলের এই জয়কে সর্বশ্রেষ্ঠ স্বীকৃতিটা দিয়েছেন খোদ সাকিবই।
'টেস্ট ক্রিকেটে পা রাখার নয় বছরে এটাই বাংলাদেশ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অর্জন।' ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক হিসেবে কথা বলতে গিয়ে এভাবেই নিজের আবেগ প্রকাশ করেন সাকিব। নিজেকে সামলে নিয়েই বলেন, 'এ বিজয় আমাদের আত্মবিশ্বাস অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। যা আমাদের পরের ধাপে এগিয়ে যেতে সহায়তা দেবে। অবশ্যই ধন্যবাদ জানাচ্ছি স্রষ্টাকে। তার কৃপায় আমরা এখন আরও এগিয়ে যেতে চাই।' প্রথম ইনিংসে ৫ রানে এগিয়ে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ২০৯ রানে গুঁড়িয়ে দিতে সাকিবেরই ছিল সবচেয়ে বড় অবদান। ক্যারিয়ারে পঞ্চমবারের মতো ৫ উইকেট শিকার করে দলকে জয়ের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

ব্যাটিং অর্ডারে নিজের অবস্থান যেহেতু ৬ নম্বরে সেহেতু দলের জয়ের বাকি আনুষ্ঠানিকতার দায়টা খুব বেশি হয়তো অনুভব করেননি দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর আগে। কিন্তু মাত্র ৬৭ রানে উপর সারির ৪ ব্যাটসম্যান সাজঘরে ফিরে যাওয়ায় স্বভাবতই হারের শঙ্কা জেগে উঠেছিল সবার মনে। কিন্তু মাঠে নেমেই সাকিব পেয়ে যান সহযোদ্ধা রকিবুল হাসানকে। দু'জনে মিলে দেখিয়েছেন কিভাবে খাদের কিনার থেকে দলকে টেনে তুলতে হয়। আর ষষ্ঠ উইকেট জুটিতে ১০৬ রানের জুটি গড়ে রকিবুল (৬৫) বিদায় নেয়ার পর সাকিব দেখিয়েছেন কিভাবে সব শঙ্কা দূর করে দলকে জেতাতে হয়। জয় থেকে দলকে ৪২ রান দূরে রেখে যখন ফিরে গেলেন রকিবুল তখন আবারও তীরে এসে তরী ডোবার ভয় পেয়ে বসে সবার মনে। জয় থেকে ১৪ রান দূরে থাকতে মুশফিক সাজঘরে ফিরে ভয়টা আরও বাড়িয়ে দেন। কিন্তু উইকেটে ছিলেন সাকিব। যে কেমার রোচের ভয়ে রীতিমতো কম্পমান ছিল বাংলাদেশ ব্যাটসম্যানরা সেই রোচের এক ওভারে দু'টি চার ও ১টি ছক্কা হাঁকিয়ে দলকে পাইয়ে দেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়। ম্যাচ জয়ের পর জোর গলায়ই বলেন কোন রকম চাপ অনুভূত হয়নি তার। বলেন, 'আমরা কখনওই খুব বেশি চাপ অনুভব করিনি। বিশেষ করে আমার নিজের মধ্যে কোন চাপ ছিল না। নিজের স্বাভাবিক খেলাটা খেলবো বলেই নেমেছিলাম। দলের সবাই দারুণ ক্রিকেট খেলেছে বলেই এমন একটা জয় এসেছে।'

প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারের অভিনন্দন

বিদেশের মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের প্রতি অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া পৃথক পৃথকভাবে জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ এডভোকেট, জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাহিদ আহসান রাসেল এমপিও অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয়ের জন্য ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়, অধিনায়ক, কোচ, টিম ম্যানেজমেন্ট এবং ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মালয়েশিয়ায় আইসিসি ট্রফি জয়ের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নবযাত্রার সূচনা হয়। পরবতর্ীতে ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপে প্রথম অংশ নিয়ে সম্মানজনক ফলাফল নিয়ে আসে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ২০০০ সালে বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা অর্জন করে। দীর্ঘদিন পর বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয় আমাদের ক্রিকেটকে আরও মর্যাদার আসনে অভিষিক্ত করেছে। তিনি এ জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। স্পিকার আবদুল হামিদ তার অভিনন্দন বার্তায় বলেন, এ অবিস্মরণীয় জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ক্রিকেট বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করবে আশা প্রকাশ করে খেলোয়াড় ও বোর্ডের প্রতি এ জয়ের ধারা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি। সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বিজয়ের পেছনে অনন্য নৈপুণ্যের জন্য ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক সাকিবকে ধন্যবাদ জানান।

দেড় কোটি টাকা বোনাস

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ করার পুরস্কার হিসেবে ক্রিকেটার এবং টিম ম্যানেজমেন্টকে দেড় কোটি টাকা বোনাস ঘোষণা করেছে। কোন সিরিজ জিতলে বিসিবি'র পক্ষ থেকে উইনিং বোনাস দেয়ার চল আগে থেকেই ছিল। তবে এবার বোনাসের পরিমাণ ক্রিকেটাররা বেশি পাচ্ছে জয়ের ব্যবধানটা ২-০ হওয়ায়। হোয়াইটওয়াশ করতে পারলে বিসিবি'র হিসাব অনুযায়ী ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা বোনাস দেয়ার কথা থাকলেও দলকে উৎসাহ দেয়ার জন্য আরও ২০ লাখ টাকা বাড়তি দেয়া হবে। গতকাল বিসিবি'র সভাপতি লেফটেন্যান্ট জেনারেল সিনা ইবনে জামালি দলকে অভিনন্দন জানিয়ে ওই বোনাস দেয়ার ঘোষণা দেন। বোনাসের অর্থ সমান ভাগে ভাগ করে দেয়া হবে টেস্ট দলের ২৩ সদস্যের মধ্যে। বিসিবি সভাপতি বলেন, 'আমি ক্রিকেটারদের পাশাপাশি টিম ম্যানেজমেন্ট ও ক্রিকেট অপারেশন্স ডিপার্টমেন্টের সকল কর্মকর্তাকে অভিনন্দন জানাই। এ বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ দল তাদের এবং লাখো ক্রিকেটপ্রেমীর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করতে পারলো। ওদিকে বাংলাদেশ দলের এমন সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আহাদ আলী সরকার। তিনি বলেন, 'এ জয় কেবল জাতীয় ক্রিকেট দলের জয় নয়। এ জয় বাংলাদেশের চৌদ্দ কোটি ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের জয়।' তিনি আজ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের বিদেশের মাটিতে প্রথম সিরিজ জয় নিয়ে একটি উন্মুক্ত আলোচনা সভার আয়োজন করছেন। এছাড়া বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছে বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন (বিওএ), ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (কোয়াব), বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), হকি ফেডারেশন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

চেয়েছিলাম সম্মানজনক প্রস্থান, সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হলাম

অবশেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে দিয়েছেন আবদুল জলিল। টানা এক বছরের বেশি সময় কাগুজে সাধারণ সম্পাদক থাকার পর গতকাল আনুষ্ঠানিকভাবে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে ওই পদ ত্যাগের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, সম্মানজনক প্রস্থানের সুযোগ পাই নি বলেই পদত্যাগ করলাম। এতে কষ্ট থাকলেও আক্ষেপ নেই। আর এছাড়া কোন বিকল্প ছিল না। পদ ছাড়লেও আওয়ামী লীগেই থাকবো। আবদুল জলিলের গুলশানের বাসায় ওই সংবাদ সম্মেলনের পর তার পক্ষে নওগাঁ জেলার কয়েকজন এমপি দলের সভানেত্রীর কার্যালয়ে এ পদত্যাগপত্র পেঁৗছে দেন। আবদুল জলিলের এ সিদ্ধান্তের সঙ্গে একাত্মতাও প্রকাশ করেন তারা। দলের জাতীয় কাউন্সিলের মাত্র দু'দিন আগে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে আবদুল জলিল বলেন, দলের কাউন্সিলে অংশ নিতে না পারার বেদনা থেকেই তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন। এ সময় তিনি সাংবাদিকদের এক পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান তিনি। তবে কোন প্রশ্নের জবাব দেননি। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রত্যাশা করেছিলাম শেষ পর্যন্ত আমি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রি বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পাবো। যখন দেখলাম, আমার শেষ সুযোগ থেকেও আমি বঞ্চিত হলাম তখন আমার সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প পথ নেই। তাই আমি আজ (গতকাল) বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ ত্যাগ করছি। তিনি বলেন, আমি যতদিন বাঁচবো বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন কর্মী হিসেবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ দলই করে যাবো। তিনি বলেন, গঠনতন্ত্র মোতাবেক সাধারণ সম্পাদক দলের কাউন্সিল অধিবেশন আহ্বান করেন। সে মোতাবেক দাওয়াত পত্র তার নামেই হওয়া বাঞ্ছনীয়। সাধারণ সম্পাদকই কাউন্সিল অধিবেশনে সাধারণ সম্পাদকের রিপোর্ট পেশ করবে। সে সুযোগ থেকেও আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে। লিখিত বক্তব্যের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আবদুল জলিল বলেন, দলের সাধারণ সম্পাদক বারবার হয় না। ১/১১-এর কারণে দলের কাউন্সিল হতে সময় লেগেছে। আমি আগেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেছি। ছয় মাস আগেও এ কথা বলেছি। পদত্যাগের পর দলের কাউন্সিল ও কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে যাবেন কিনা সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এখনও কাউন্সিলর আছি। বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করে দেখবো। সাধারণ সম্পাদকের পদ ছাড়ার ঘোষণা দেয়ার সময় তার বাসায় নওগাঁ জেলার পাঁচ এমপি এমাজউদ্দিন প্রামাণিক, ইসরাফিল আলম, সাধন কুমার মজুমদার, শহিদুজ্জামান সরকার, শাহীন মনোয়ারা হকসহ জেলা আওয়ামী লীগের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। আবদুল জলিলের এ ঘোষণার পর তাদের অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে দলের ১৯তম কাউন্সিলে আবদুল জলিল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালের ২৮শে মে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাবন্দি অবস্থায় একটি চিঠিতে তিনি দলের সাধারণ সম্পাদকের পদ ছাড়ার ঘোষণা দিলেও জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তিনি ফের পদে ফেরার ঘোষণা দেন। এ নিয়ে দলে জটিলতা দেখা দেয়। সাধারণ সম্পাদকের পদে থাকলেও তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। সে সময় থেকে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ২০০৮ সালের ২রা মার্চ চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি পান আবদুল জলিল। সিঙ্গাপুরে ছয় মাস চিকিৎসা নেয়ার পর গত বছরের ৩১শে আগস্ট তিনি দেশে ফেরেন। এরপর ২০শে অক্টোবর অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে দায়ের করা দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় হাইকোর্ট থেকে তিনি জামিন পান। কারাবন্দি অবস্থায় তিনি হাসপাতাল হতে রাজনীতি থেকে অবসর নেয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি দিয়েছিলেন। তার নিজের স্বাক্ষর করা ওই চিঠি গত বছরের ৫ই জুলাই তার স্ত্রী রেহানা জলিল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করেন। তখন ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগে গণতন্ত্রের চর্চা নেই এবং এর জন্য সভানেত্রী শেখ হাসিনাকেও দায়ী করেছিলেন তিনি। চিঠিতে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ একটি গণতান্ত্রিক দল হয়েও এটি এখন একনায়ককেন্দ্রিক দলে পরিণত হয়েছে। সভানেত্রীর একক নেতৃত্বে দল চলার কারণে এ অবস্থা এবং বিপর্যয় হয়েছে। ওই চিঠির সূত্র ধরেই আবদুল জলিলের সাধারণ সম্পাদকের পদ ঝুলে যায়। সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব চালিয়ে যাওয়ার জন্য দলের নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বলা হয়। দেশে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জলিলের যে চিঠি তার স্ত্রী রেহানা জলিল প্রকাশ করেছিলেন তাতে রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার জন্য তিনি তার অসুস্থতা এবং পারিবারিক কারণ উল্লেখ করেছিলেন। তবে মামলায় জামিন পাওয়ার পর তিনি দাবি করেন, বাধ্য হয়েই তিনি ওই চিঠি লিখেছিলেন। ওই চিঠির বক্তব্য অস্বীকার করে আবদুল জলিল তখন বলেছিলেন, কারাবন্দি অবস্থায় কি চিঠি কোথায় কিভাবে এসেছে তা আপনারা সবাই বোঝেন। তিনি বলেন, বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে তার স্ত্রী সরকারের কাছে আবেদন করেছিলেন। রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার মতো কোন চিঠি তিনি পড়েননি। কারামুক্ত হওয়ার পর দলের বৈধ সাধারণ সম্পাদক দাবি করে আবদুল জলিল বেশ কয়েকবার তাকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়ার দাবি জানান। সম্প্রতি তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বলেন, উপদেষ্টারা গোপনীয়তা রক্ষার শপথ নেন নি। তাদের মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত থাকারও সাংবিধানিক বৈধতা নেই। সমপ্রতি দলের জাতীয় কাউন্সিল প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরও তিনি বেশ কয়েকবার এ প্রক্রিয়ায় তাকে যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এ নিয়ে তিনি সংবাদ মাধ্যমে খোলামেলা কথাও বলেন। সর্বশেষ গত ১৭ই জুলাই দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সাজেদা চৌধুরী সাংবাদিকদের এ বিষয়ে জানান, অসুস্থতার কারণে আবদুল জলিলকে দলের কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটিতে রাখা হয়নি।

আবদুল জলিল ছাত্র জীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৫৭ সালে তিনি রাজশাহী সরকারি কলেজের ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬০-৬১ সালে ঢাকা রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সদস্য ছিলেন। ১৯৬২ সালে ডাকসু'র কমন রুম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালের মার্চে তিনি ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য লন্ডন চলে যান। ১৯৬৯ সালে দেশে ফিরে গণআন্দোলন এবং পরে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর একবার এবং ১৯৮২ সালে এরশাদ সরকারের সময় কারাবরণ করেন। ১৯৮১ সালে দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে তিনি প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালেও একই আসন থেকে তিনি এমপি হন। ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। গত নির্বাচনেও তিনি নওগাঁ থেকে সংসদ সদস্য হন।

July 15, 2009

দেশের বাইরে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়

প্রথম টেস্ট জয়ে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল প্রায় ৫ বছর। ২০০৫-এর জানুয়ারিতে বাংলাদেশ প্রথম জয়টি পায় জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে। তার সাড়ে ৪ বছর পর এলো দ্বিতীয় জয়টি। তবে ৬০ টেস্টে দেশের বাইরে এটিই বাংলাদেশ দলের প্রথম জয়। তবে প্রথমবারের মতো দলকে নেতৃত্বে দিতে এসেই মাশরাফী পেলেন চূড়ান্ত সাফল্য। অবশ্য ইতিহাস গড়া জয়ের কৃতিত্বের সিকি ভাগও দাবি করেননি নয়া অধিনায়ক। ম্যাচের তৃতীয় দিন সকালে হাঁটুর ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে মাঠ ছাড়ার পর আদতে নামেই অধিনায়ক ছিলেন মাশরাফী। গত পরশু কিছুক্ষণের জন্য ব্যাট হাতে নেমেছিলেন মাঠে। কোন রান না করেই বিদায় নিয়েছেন তিনি। প্রায় তিন দিন মাশরাফীর অনুপস্থিতিতে দলের দায়িত্ব পালন করেছেন অধিনায়কত্বের কোনরকম অভিজ্ঞতা ছাড়া সাকিব আল হাসান। আর প্রথম পরীক্ষায় লেটার মার্কসসহ পাস করেছেন সাকিবও। অন্তত মাশরাফীর চোখে বাংলাদেশের জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান সাকিবেরই। নিজের অনুপস্থিতিতে যেভাবে দলকে পরিচালনা করেছেন সাকিব_ তা দেখে অভিভূত মাশরাফী নিজেও। যে কারণে ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বারবারই সাকিবকে জানালেন 'স্পেশাল থ্যাঙ্কস'। সে সঙ্গে ধন্যবাদ জানাতে ভোলেননি ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেই ৮ (প্রথম ইনিংসে ৩/৫৯ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৫/৫১) উইকেট নেয়া অফ স্পিনার মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ এবং প্রথম সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে দলকে লড়াইয়ের পুঁজি দেয়া তামিম ইকবালকে। তাদের কৃতিত্বেই যে ২৭৭ রানের টার্গেট দিয়ে বাংলাদেশ জিতেছে ৯৫ রানে।

দেশত্যাগের আগে ডেপুটি সাকিবের ওপর অগাধ আস্থার কথা জানিয়ে গিয়েছিলেন মাশরাফী। তবে সকলের মতো নিজেও ভাবেননি অধিনায়ক হিসাবে নিজের প্রথম ম্যাচেই সাকিবের ওপর নির্ভর করতে হবে তাকে। কিন্তু তা-ই হয়েছে। দলকে ঐতিহাসিক জয় পাইয়ে দেয়ার জন্য সাকিবকে ধন্যবাদ দিয়ে মাশরাফী বলেন, 'আমার অনুপস্থিতিতে দলকে যেভাবে ও পরিচালনা করেছে তার জন্য ওকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই। এমন একটা জয়ের পর ইনজুরির হতাশা অনেকটাই কেটে গেছে আমার।' ম্যাচ জয়ের দুই নায়ক রিয়াদ এবং তামিম সম্পর্কে মাশরাফী বলেন, 'ওদের দু'জনকে কেবল ধন্যবাদ দিয়ে খাটো করা যাবে না। ওরা যা করেছে তার ফলাফলই হচ্ছে এই জয়।' পঞ্চম দিনে দলের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানাতে গিয়ে মাশরাফী বলেন, 'আমাদের লক্ষ্য ছিল মধ্যাহ্ন বিরতি পর্যন্ত ব্যাটিং করে ৩০০ অথবা তারচেয়েও বেশি টার্গেট ওদের দিকে ছুড়ে দেয়া। কিন্তু দ্রুত ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলি আমরা। তারপরও আত্মবিশ্বাস ছিল দলে দু'জন নির্ভরযোগ্য স্পিনার থাকায়। সাকিব ও রিয়াদ দুর্দান্ত বোলিং করেছে। ওদের কৃতিত্ব দিচ্ছি এ কারণেই যে আমার ইনজুরির কারণে দল একজন বোলার কম নিয়ে খেলেছে। তারপরও আমরা জিতেছি।'


২৫২ রানের লিড নিয়ে চতুর্থ দিনে মাঠ ছেড়েছিল ৫ উইকেট হারানো বাংলাদেশ। আগের দিনের ৩২১ রানের সঙ্গে আর ২৪ রান যোগ করতেই শেষ বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। মাত্র চার রান তুলতেই বাংলাদেশ হারিয়েছে শেষ ৪ উইকেট। ৩৪৫ রানে গুটিয়ে যাওয়ায় স্বাগতিকদের জন্য ২৭৭ রানের টার্গেট ছুড়ে দিতে পারে বাংলাদেশ। ৮০ ওভারে ওই লক্ষ্য ছোঁয়া যে অসম্ভব তা বলা যাবে না। উপরন্তু প্রতিপক্ষ দলের মূল বোলারই যেখানে ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়ে মাঠের বাইরে সেখানে কাজটা আরও সহজ। কিন্তু সেন্ট ভিনসেন্টের ব্যাটিং সহায়ক উইকেট পঞ্চম দিনে যে স্পিনসহায়ক হয়ে উঠবে তা কে-ই বা ভেবেছিল। তৃতীয় ওভারেই সরাসরি থ্রোতে রিচার্ডসকে রানআউট করে শুরুটা করেছিলেন রকিবুল হাসান। এরপর ষষ্ঠ ওভারে প্রথম ইনিংসের নায়ক ফিলিপসকে এলবিডবি্লউ'র ফাঁদে ফেলেন সাকিব। ৩৩ রানে ২ ওপেনারকে হারিয়ে স্বভাবতই খোলসে ঢুকে পড়েন উইন্ডিজ ব্যাটসম্যানরা। যে কারণে বাংলাদেশকে তৃতীয় সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করতে হয় প্রায় ১ ঘণ্টা। কাপ্তান রেইফার (১৯)কে দিয়ে শুরু হয় রিয়াদের ধ্বংসযজ্ঞ। পরের ওভারেই তিনি পথ ধরান ডাউলিনকে। এর চার ওভার বাদে রিয়াদের শিকার সংখ্যা ৩ হয় ওয়ালটন (১০)কে এলবিডবি্লউ করে। তার বিদায়ের পর বেশ খানিকক্ষণের বিরতি। স্বাগতিকদের ড্রয়ের আশা জাগিয়ে রাখা বার্নার্ডের সঙ্গে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছিলেন সামি। কিন্তু ৪২ বলে ১৯ রান করে তাকেও হার মানতে হয় সাকিবের কাছে। চা বিরতির আগে ৬ উইকেট তুলে নিয়ে স্বভাবতই উজ্জীবিত মনে হয়েছে বাংলাদেশকে। শেষ সেশনে তাদের প্রয়োজন আর ৪টি উইকেট। কিন্তু ওই চার উইকেট নিতেই কম লড়াই করতে হয়নি বাংলাদেশের স্পিনারদের। একদিকে দেয়াল হয়ে ছিলেন বার্নার্ড। অন্যদিকে মিলারের উইকেট অাঁকড়ে পড়ে থাকার চেষ্টা। মাত্র ৫ রান করলেও ৫৪ বল খরচ করে বার্নার্ডকে ভালই সহায়তা দেন মিলার। জুটিটা যখন জমে উঠছিল তখনই সাকিব বল তুলে দেন অভিজ্ঞ আশরাফুলের হাতে। ব্রেক থ্রু দিতে সিদ্ধহস্ত আশরাফুল এবার দলকে উৎসবে মাতালেন মিলারকে বিদায় করে। এরপর ২৪ বল খেলে রানের খাতা না খোলা অস্টিনকে এলবিডবি্লউ করে প্রথম ইনিংসের সাফল্যকেও ছাড়িয়ে যান রিয়াদ। পরের ওভারেই রোচকে মুশফিকের গ্লাভসবন্দি। ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্টেই ৫ উইকেটের কৃতিত্ব গড়েন রিয়াদ। তারপরও দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়েনি বাংলাদেশের। একপ্রান্তে বার্নার্ড অবিচল ফিফটি হাঁকানোর পাশাপাশি ম্যাচটা ড্র করার ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। কিন্তু দলকে জয়ের বন্দরে পেঁৗছে দেন সাকিব। শেষ ব্যাটসম্যান টিনো বেস্টকে ফুলটস বলে এলবিডবি্লউ করে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদটা এনে দেন সাকিব। উইন্ডিজের ইনিংস গুটিয়ে যায় ১৮১ রানে।


সংক্ষিপ্ত স্কোর:

বাংলাদেশ ২৩৮ এবং ৩৪৫/১০, ১২০.১ ওভার (তামিম ১২৮, জুনায়েদ ৭৮, মুশফিক ৩৭, সাকিব ৩০, ইমরুল ২৪, রকিবুল ১৮, রিয়াদ ৮, আশরাফুল ৩, রুবেল ১, মাশরাফী ০, শাহাদাত ০, সামি ৫/৭০, রোচ ৩/৬৭)। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩০৭ এবং ১৮১/১০, ৭০.১ ওভার (বার্নার্ড ৫২, সামি ১৯, ডাউলিন ১৯, রেইফার ১৯, রিচার্ডস ১৪, ফিলিপস ১৪, ওয়ালটন ১০, রিয়াদ ৫/৫১, সাকিব ৩/৩৯, আশরাফুল ১/৪)। ফল: বাংলাদেশ ৯৫ রানে জয়ী। সিরিজ: ২ ম্যাচ টেস্ট সিরিজ বাংলাদেশ ১-০ তে এগিয়ে। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: তামিম ইকবাল (বাংলাদেশ)।

July 4, 2009

মাইকেল জ্যাকসনের শেষ বিদায় অনুষ্ঠান 'দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ'

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আয়োজন, ১০ লাখ ভক্ত পপসম্রাটের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাবেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, ৭৫ কোটি মানুষের চোখ থাকবে টিভি'র পর্দায়, ১৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে আবৃত করা হয়েছে কফিন

গান গেয়ে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে নেয়া পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের শেষ বিদায় মঙ্গলবার। এ জন্য প্রস্তুত স্ট্যাপলস সেন্টার। কান্না চেপে রুদ্ধশ্বাস প্রতীৰা ভক্তদের। আর মাত্র তিনটি দিন পরই ভালবাসায়, আবেগে সিক্ত ১০ লাখ ভক্ত তাকে চিরদিনের জন্য বিদায় জানাবেন। টেলিভিশনে সরাসরি বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেই বিদায় জানানোর আয়োজনে অংশ নেবে ৭৫ কোটি মানুষ। লস অ্যানজেলেসের স্ট্যাপলস সেন্টারে শ্রদ্ধা নিবেদনের এই পর্বকে 'দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ' বা বিশ্বের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধা জানানোর শো নামে অভিহিত করা হয়েছে। এতে উপস্থিত থাকতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামাকে। উপস্থিত থাকতে পারেন স্যার পল ম্যাককার্টনি, সংগীতশিল্পী ডায়ানা রস এবং চলচ্চিত্র জগতের জীবন্ত কিংবদন্তি, মাইকেলের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী এলিজাবেথ টেলর। এ খবর দিয়ে দ্য সান অনলাইন জানায়, মাইকেল জ্যাকসনের স্বপ্ন অনুযায়ী তার শেষ বিদায় অনুষ্ঠানকে 'দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ' হিসেবে আয়োজন করা হচ্ছে। এর আগে ক্যালিফোর্নিয়ার নেভারল্যান্ড র্যাঞ্চে বৃহস্পতিবার বা গতকাল শুক্রবার এ শ্রদ্ধা নিবেদনের কথা মিডিয়ায় বলা হলেও বৃহস্পতিবার জ্যাকসন পরিবার সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে জানায়, আগামী মঙ্গলবার স্ট্যাপলস সেন্টারে হবে এ অনুষ্ঠান। তবে তাকে কোথায় সমাহিত করা হবে তা জানা যায়নি। মৃতু্যর আগের দিন এই স্ট্যাপলস সেন্টারে লন্ডন কনসার্ট উপলক্ষে রিহার্সালে জীবনের শেষ গান গেয়েছিলেন মাইকেল। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সেদিন তিনি তরতাজা যুবকের মতো নেচেছেন, গেয়েছেন। স্ট্যাপলস সেন্টার স্টেডিয়ামে আসন সংখ্যা ২০ হাজার। ফলে বাড়তি ভক্তরা যেন শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠান থেকে বাদ না পড়েন সেজন্য এর বাইরে স্থাপন করা হচ্ছে বিপুল সংখ্যক জায়ান্ট স্ক্রিন বা টেলিভিশনের বিশাল পর্দা। তবে মাইকেল জ্যাকসনের সবচেয়ে সফল অ্যালবাম 'থ্রিলার', 'অফ দ্য ওয়াল' এবং 'ব্যাড'-এর চিন্তা যার মস্তিষ্ক থেকে এসেছিল সেই কুইন্সি জোন্স এতে উপস্থিত থাকবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মাইকেলের বিদায়ের এ অনুষ্ঠান আমি সইতে পারবো না বলে তা প্রত্যৰ করতে চাই না। জীবনে আর কোন বিদায় অনুষ্ঠানে যাবো না। বিশ্বাস করুন, আমি আর সহ্য করতে পারছি না। মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, ১৫ হাজার পাউন্ড মূল্যের ১৪ ক্যারেট সোনা দিয়ে আবৃত কফিনে করে সমাহিত করা হবে মাইকেলকে। এর ভিতর দিকে ব্যবহার করা হয়েছে প্রমিথিয়ান নামে ব্রঞ্জ। বেটসভিল ক্যাসকেট কোম্পানিতে অর্ডার দিয়ে বানানো হয়েছে এ কফিন। এর অভ্যন্তরে আছে নীল ভেলভেট কাপড়ের স্তর। দক্ষ হাতে তা পলিশ করা। ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে কিংবদন্তির আরেক সংগীতশিল্পী জেমস ব্রাউনকে একই রকম কফিনে করে সমাহিত করা হয়েছিল। এ শিল্পীকে সমাহিত করতে যেয়ে মাইকেল তার মাথায় চুমু খেয়েছিলেন। ওদিকে স্ট্যাপলস সেন্টারে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যাওয়া ভক্তদের কাছ থেকে এর মালিক লন্ডনের এইজি লাইভ জনপ্রতি ১৫ পাউন্ড আদায় করতে পারে বলে আলোচনা চলছে। তবে এ খবরে ভক্তরা ভীষণ হতাশ। জ্যাকসন পরিবার এ আয়োজনে ভক্তদের কাছ থেকে কোন অর্থ না নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ওদিকে স্ট্যাপলস সেন্টার স্টেডিয়ামে বার্নাম এন্ড বেইলি সার্কাসের শো শুরু হবার কথা। মাইকেলের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের সময়টা তাদেরকে ছাড় দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে মাইকেল পরিবার। জবাবে সার্কাস সংশ্লিষ্ট একজন বলেছেন, হঁ্যা এটাতো ব্যতিক্রমী আয়োজন। আমি নিশ্চিত, মাইকেল শেষ বিদায়কালে বাঘ আর পশু পাখিদের দেখে হাসবেন। তিনি ভীষণ খুশি হবেন। কারণ পশুপাখি তার খুব প্রিয়। মাইকেল জ্যাকসন তার শেষ বিদায় নিয়ে খুব কম কথাই বলতেন। ২০০২ সালে তিনি একবার বলেছিলেন, আমার শেষ বিদায় হবে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। আমি এমনটাই চাই। আমি চাই সে অনুষ্ঠানে থাকবে আতশবাজি, থাকবে আরও সব আয়োজন। এ প্রসঙ্গে জ্যাকসন পরিবারের মুখপাত্র ব্রায়ান অক্সম্যান বলেছেন, তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে এ আয়োজন হবে বিশাল, অকল্পনীয়। আয়োজন শুরু হবে স্থানীয় সময় সকাল ১০টায়। চলবে দু' ঘণ্টা। ১৯৭৭ সালে মেমফিসের রাস্তায় মাইকেলের প্রথম শ্বশুর এলভিস প্রিসলির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন ৭৫ হাজার মানুষ। মাইকেলের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে অংশ নেয়া ভক্তদের সংখ্যা ওই সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে। বৃটেনের হাইড পার্কে প্রিন্সেস ডায়ানাকে ১২ বছর আগে দুই লাখ ৫০ হাজার মানুষ শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন। সে হিসাবে মাইকেলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন রেকর্ডসংখ্যক মানুষ। ওদিকে লন্ডনে এইজি লাইভ আয়োজিত কনসার্ট উপলক্ষে মারা যাওয়ার আগের দিনও স্ট্যাপলস সেন্টারে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে রিহার্সাল করেছেন মাইকেল। ১৯৯৫ সালে 'দে ডোন্ট কেয়ার এবাউট আস' গানে তিনি যে পারফর্ম করেছিলেন একই রকম প্রাণশক্তি ছিল তাতে। ওই রিহার্সালের ভিডিও ধারণ করা ছবিতে তাকে দেখায় অত্যন্ত সতেজ, সজীব। তবে তিনি সচরাচর যেরকম নাচেন তার থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল এতে। তিনি ছিলেন পুরো ফিট। সেখানে গান শেষ হতেই গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা যায় এবং মাইকেল বলে ওঠেন- হোল্ড ফর এপ্লাউস। অর্থাৎ তোমরা হর্ষধ্বনি কর।


ওদিকে মাইকেলকে কোথায় সমাধিস্থ করা হবে পরিবার সে ব্যাপারে সিদ্ধান্তে পেঁৗছতে না পারলেও তার বড়ভাই মাইকেল জার্মেইন তাকে নেভারল্যান্ড র্যাঞ্চে সমাহিত করার পক্ষে। সেখানে আছে মাইকেলের পোষা জিরাফ, বাঘ আর ব্যক্তিগত বিস্ময়কর এক পার্ক। এগুলো মাইকেলের সৃষ্টি। তাই নিজের সৃষ্টির মাঝেই মাইকেলকে চিরবিদায় দিতে চান তিনি। ওদিকে লস অ্যানজেলেসের পাহাড়ঘেরা ১০০ নর্থ ক্যারলউড ড্রাইভ নামের বাড়িতে গত ২৫শে জুন মারা যান মাইকেল জ্যাকসন। এ বাড়িটির মালিক হুবার্ট গুয়েজ নামের এক ব্যক্তি। ভাড়া বাবদ প্রতি মাসে মাইকেল তাকে দিতেন এক লাখ ডলার। নেভারল্যান্ড খামারবাড়িতে থাকাকালে একটি শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর থেকে মাইকেল এ বাড়িতে ছিলেন। ফলে এ বাড়িটির সঙ্গে মাইকেল জ্যাকসনের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। এ জন্য বাড়িটি কিনে তা মাইকেলের স্মৃতির উদ্দেশে উৎসর্গ করতে চান ফরাসি ফ্যাশন মোগল বলে পরিচিত ক্রিশ্চিয়ান অডিগিয়ার। মাইকেল জ্যাকসনের পোশাকের ডিজাইনারও তিনি।


ওবামার শ্রদ্ধা

মারা যাওয়ার এক সপ্তাহেরও বেশি পরে পপসংগীতের সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা। মাইকেল মারা যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা জানিয়ে একটি চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু বিশ্ববাসীর কাছে আদর্শ হয়ে ওঠা এ শিল্পীর প্রতি শেষ পর্যন্ত তিনি শ্রদ্ধা জানালেন। বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া এ খবর দিয়েছে। এতে বলা হয়, বারাক ওবামা বলেছেন, আমাদের এ যুগের সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে তিনি ইতিহাসে ঠাঁই পাবেন। তার গান শুনে শুনে আমি বড় হয়েছি।


ডেবি রাউ কি পিছু হঠবেন

মাইকেল জ্যাকসনের সহায় সম্পত্তি ও সন্তানদের নিয়ে জটিলতা শেষ হয়নি। তিনি মারা যাওয়ার পরপর আদালতের রায়ে তিন সন্তান প্রিন্স (১২), প্যারিস (১১) এবং দ্বিতীয় প্রিন্স (৬) রয়েছে দাদি ক্যাথেরিন জ্যাকসনের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু তা চূড়ান্ত সমাধান নয়। প্রিন্স এবং প্যারিস জন্মেছে মাইকেলের দ্বিতীয় স্ত্রী ডেবি রাউয়ের গর্ভে। ফলে তিনি এখন সন্তানের দাবি তুলেছেন। সে দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে আবেদন দাখিল করেছেন ক্যাথেরিন। এ বিষয়ে এখনও ডেবি করণীয় ঠিক করেননি বলে বৃহস্পতিবার তার আইনজীবী এরিক জর্জ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইকেলের সঙ্গে ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ থাকাকালে ডেবির গর্ভে প্রথম দু'সন্তানের জন্ম হয়। তারপর থেকে সন্তানদের সঙ্গে ডেবির কোন যোগাযোগ ছিল না। ফলে এখনও মাতৃত্বের দাবি নিয়ে তিনি সন্তানদের দেখে আসতে পারেন। কিন্তু আইনি লড়াইয়ে হেরে গেলে তিনি সে সুযোগও হারাবেন। এমনটি মনে করেন ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার আইনের প্রফেসর স্কট অল্টম্যান। এ বিষয়ে সোমবার শুনানি হওয়ার কথা থাকলেও তা পরিবর্তন করা হয়েছে। সে অনুযায়ী আগামী ১৩ই জুলাই শুনানি হবে। ওদিকে ২০০২ সালে লস অ্যানজেলেস সুপেরিয়র কোর্টে মাইকেল যে উইল করে গেছেন তাতে নাম নেই ডেবি রাউ বা মাইকেলের পিতা জোসেফ জ্যাকসনের। সেখানে মা ক্যাথেরিনকে অভিভাবক ঘোষণা করেছেন মাইকেল।


জ্যাকসন পরিবার অর্থ খুঁজতে ব্যস্ত বলেছেন গ্রেস ররামবা

মাইকেল জ্যাকসন ও তার তিন সন্তানের দেখাশোনা করতেন উগান্ডায় জন্মগ্রহণকারী গ্রেস ররামবা (৪২)। মারা যাওয়ার মাত্র দু'মাস আগে মাইকেল তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করেন। মাইকেল মারা যাওয়ার পর তিনি মাইকেলের জীবনের অজানা অধ্যায়, তার পরিবারের সদস্যদের আচরণ সম্পর্কে খোলামেলা কথা বলেছেন। তবে বরখাস্ত হওয়ার কারণে প্রতিশোধ নিতে তিনি এসব কথা বানিয়ে বলেছেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। গ্রেস বলেছেন, মারা যাওয়ার পরপরই পরিবারের সদস্যরা মাইকেলের রেখে যাওয়া অর্থের খোঁজে ছিলেন সবচেয়ে ব্যস্ত। তারা তার ব্যাগ, কার্পেটের নিচে তন্ন তন্ন করে অর্থ খুঁজতে থাকেন। অবসরে লন্ডন এসেছিলেন গ্রেস। এরই মধ্যে মাইকেল মারা যান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ওই সময় একের পর এক ফোন যায় তার কাছে। আত্মীয়রা জানতে চান মাইকেল কোথায় কোথায় অর্থ রাখে। গ্রেস ররামবা জ্যাকসন-ফাইভ-এর সেক্রেটারি ছিলেন ১৭ বছর এবং মাইকেলের সন্তানদের দেখাশোনা করেছেন ১২ বছর। তিনি বলেছেন, মাইকেলের তিন শিশুর প্রতিটিকে জন্মের পর থেকেই আমার হাতে মানুষ হয়েছে। সে হিসেবে তারা আমার সন্তান। তাদেরকে রেখে এলেই ফোন আসতো - তাদের প্রতি অবহেলা করা হচ্ছে। তাদের ঘর অপরিষ্কার। মাইকেল ভাল নেই। অপরিষ্কার হয়ে গেছেন। শেভ করেন না। ঠিকমতো খাবার খান না। এসব কিছু আমি দেখাশোনা করতাম। গ্রেস আরও বলেছেন, মাইকেল বাচ্চাদের মাস্ক ছাড়া বাইরে বেরুতে দিতেন না। কিন্তু বাচ্চারা তা পছন্দ করতো না। এ জন্য মাইকেল সব সময় রাগান্বিত থাকতো। বাচ্চাদের কোন শিক্ষক দেয়া হতো না। তারা অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পেতো না। ফলে তারা বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে জানতে পারতো না। মাইকেলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু দীপক চোপড়া বলেছেন, মাইকেলের সন্তানরা গ্রেসকে খুব পছন্দ করতো। তারা তাকে মাম বলে ডাকতো। এই গ্রেসের কাছেই মাইকেল তার জীবনের সব সত্য কথা বলেছেন।

Khoj Khobor