September 13, 2009

থেমে গেছে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের জীবন 'গাড়ি'

'গাড়ি চলে না, চলে না, চলে না রে, গাড়ি ...'। এবার নিজের গাড়িই থেমে গেছে। বিশ্ববিখ্যাত বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম আর নেই। শনিবার সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে সিলেট নগরীর একটি ক্লিনিকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। তার কণ্ঠে আর শোনা যাবে না 'আমি কূলহারা কলঙ্কিনী, আমারে কেউ ছুঁইও না গো স্বজনী, 'গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান ...', 'মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে, দেওয়ানা বানাইছে ...', 'আসি বলে গেল বন্ধু আইল না ...', 'প্রাণবন্ধু আসিল ঘরে, আমার আনন্দের সীমা নাই ...', 'ও আমার প্রাণ বন্ধুয়া তুলনা নাই ...', 'বন্ধু তোর লাইগা রে ...', 'রঙের দুনিয়া তোরে চায় না ...', 'আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ...'সহ অসংখ্য সুমধুর গান। তিনি অমর হয়ে থাকবেন পৃথিবীর বুকে। গতকাল সকালে মৃত্যুর খবরটি ছড়িয়ে যাওয়ার পরই সিলেটের সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ গানপ্রিয় মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুতে গভীর শোখ প্রকাশ করেছেন। দুপুরে ক্লিনিক থেকে তাকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আনা হলে শেষ শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন স্তরের লোকজন। গতকাল এক শোক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাউল সম্রাটের মৃত্যুতে বাঙালি সংস্কৃতির অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। অসম্প্রদায়িক চেতনায় বলিষ্ঠ মানবতাবাদী লোকশিল্পী হিসেবে তার অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। শেখ হাসিনা শিল্পীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন বাউল শাহ আবদুল করিম। অবস্থার অবনতি ঘটলে কয়েকদিন আগে তাকে সিলেটের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। শুক্রবার দুপুর থেকে তাকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল বলে তার ছেলে শাহ নূর জালাল জানান। তাকে চিকিৎসাসেবা দেয়া ডা. সুজন বোস জানান, সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে মারা যান আবদুল করিম। দুপুর ১টার দিকে তার মরদেহ শহীদ মিনারে আনা হলে মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন, শফিকুর রহমান চৌধুরী এমপি, সিলেটের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় কমিশনার ফজলুর রহমান, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইনাম আহমদ চৌধুরী, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মিছাবহ উদ্দিন সিরাজ, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ ন ম শফিকুল হক, গণতন্ত্রী পার্টির জেলা সভাপতি ব্যারিস্টার আরশ আলী, ন্যাপ সভাপতি সৈয়দ আবদুল হান্নান, কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি বেদানন্দ ভট্টাচার্য, জাসদ সেক্রেটারি লোকমান আহমদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শহীদুল আলম, বিয়ানীবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল খালিক মায়ন, সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আশফাক আহমদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী নেতারা তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানান। দুপুর ২টার পর হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইমামতি করেন দরগা মসজিদের ইমাম হাফিজ আসাদ আহমদ।

এছাড়া অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদের পক্ষ থেকেও তার কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী প্রয়াতের ছেলে নূর জালালের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন এবং তাকে সমবেদনা জানান। বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীও প্রয়াতের ছেলের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে তাকে সমবেদনা জানিয়েছেন।

তার মুত্যুতে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি শোক বই খোলা হয়েছে। তার লাশ সিলেট ডায়াবেটিক হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখা হয়। আজ রোববার সকালে তার দ্বিতীয় জানাজা দিরাই উপজেলা সদরে এবং বাদ জোহর তৃতীয় জানাজা উজানধলে নিজ গ্রামে অনুষ্ঠিত হবে। পরে স্ত্রী সরলার কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হবে।

ছোটবেলা থেকে আবদুল করিম ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। গ্রামের পাঠশালা বিদ্যালয়ে মাত্র ৮ দিন শিক্ষা নেন তিনি। এরপর যা শিখেছেন তা শুধু নিজ চেষ্টায়। দারিদ্র্যে মাধ্যমে কঠোর পরিশ্রমে বেড়ে ওঠেন তিনি। শৈশব থেকে তার নিত্যসঙ্গী ছিল একতারা। সঙ্গীতের প্রতি তিনি এতই অনুরাগী ছিলেন যে, তা ছেড়ে তিনি কোন চাকরিতে যোগ দেননি। ফলে দারিদ্র্য কখনও তার পিছু ছাড়েনি। কিন্তু তাতে কি; সঙ্গীতের ফাঁকে কৃষিকাজে নিয়োজিত করেন নিজেকে। অত্যন্ত সাদাসিদেভাবে তার জীবন কাটলেও কেউ তাকে কোন প্রলোভনে আকৃষ্ট করে দূরে সরাতে পারেনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাউল করিম তার আধ্যাত্মিক গানের তালিম নেয়া শুরু করেন কমর উদ্দিন, সাধক রশিদ উদ্দিন, শাহ ইব্রাহীম মোস্তান বকশের কাছ থেকে। কালজয়ী এ বাউল সম্রাটের দীর্ঘ জীবনে প্রায় ১৬শ' গান লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন। যেগুলো ছয়টি বইয়ে গ্রন্থিত আছে। তার উল্লেখযোগ্য অসংখ্য গান রয়েছে। বাংলা একাডেমীর উদ্যোগে তার ১০টি গান অনূদিত করা হয়েছে। বাউল সম্রাটের গান ভাষা আন্দোলনসহ মুক্তিদ্ধুদ্ধে নানা অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি ১৫ বছর বয়সের ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তার গানে ফুঠে উঠেছে গ্রাম্য কৃষক, মেহনতি মানুষের দুঃখদশা এবং সমাজে বিভেদের বিষয়টিও উঠে এসেছে। তার কালজয়ী গান অমর হয়ে আছে পৃথিবীর বুকে।

সংক্ষিপ্ত জীবনী

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময়ে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার হাওরবেষ্টিত উজানধল গ্রামে শাহ আবদুল করিম জন্মগ্রহণ করেন অতি সাধারণ এক দরিদ্র পরিবারে। তার বাবার নাম ইব্রাহিম আলী। মায়ের নাম নাইওরজান বিবি। স্ত্রী সরলার মৃত্যুর পর বাউল কবি অনেকটাই মুষড়ে পড়েন। ১৯৫৭ সাল থেকে তিনি স্থায়ীভাবে নিজ গ্রামে বাস করছেন। তার একমাত্র ছেলের নাম শাহ নূরজালাল।

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম দেহতত্ত্ব, নিগূঢ়তত্ত্ব, বাউলতত্ত্ব, মুর্শিদী গানসহ অসংখ্য গণসঙ্গীত রচনা করেছেন। তিনি কাগমারী সম্মেলনে গান করে মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সানি্নধ্যে আসেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ অসংখ্য জাতীয় নেতা তার গানে বিমোহিত ছিলেন।

বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে প্রথম বই আফতাব সঙ্গীত বের হয়। গণসঙ্গীত ১৯৫৭, কালনীর ঢেউ ১৯৮১, ধলমেলা ১৯৯০, ভাটির চিঠি ১৯৯৮ ও কালনীর কূলে ২০০১ সালে বের হয়। চলতি বছরের মে মাসে তার রচনা সমগ্র বের করে সিলেটের খান বাহাদুর এহিয়া ওয়াকফ এস্টেট। ২০০১ সালে তাকে তার কালজয়ী সৃষ্টির স্বীকৃতির জন্য রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার একুশে পদক প্রদান করা হয়। এছাড়াও ২০০০ সালে কথাসাহিত্যিক আবদুর রউফ পদক, রাগীব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার, ২০০৪ সালে মেরিল প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা, ২০০৫ সালে সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক এওয়ার্ড, ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সম্মাননা, ২০০৬ সালে অভিমত সম্মাননা, ২০০৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা, ২০০৮ সালে খান বাহাদুর এহিয়া এস্টেট সম্মাননাসহ দেশ-বিদেশে অসংখ্য সংবর্ধনা দেয়া হয় তাকে। এছাড়া তিনি ১৯৪৬, ১৯৮৫ ও ২০০৭ সালে বিলাত ভ্রমণ করেন।

সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠারস্বপ্ন পূরণ হলো না

সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন পূরণ করে যেতে পারলেন না বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম। তার স্বপ্ন ছিল গ্রামের বাড়ি দিরাইয়ের উজানধল গ্রামে বাড়ির আঙিনায় একটি সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। যে গান শিখবে শিশুসহ সব বয়সীরা। শাহ আবদুল করিমের ইচ্ছা তার বাড়ির আঙিনায় সঙ্গীত বিদ্যালয় হোক; কিন্তু বার বার প্রশাসন অন্য স্থানে করতে চাওয়ায় তা ঝুলে যায়।

শাহ আবদুল করিমের ছেলে শাহ নূর জালাল জানান, বাবার স্বপ্ন ছিল সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের আগেই চলে গেলেন।' এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সামছুল ইসলাম জানান, এই বাউলের জন্য সঙ্গীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা দরকার। জায়গা পেলে শিগগির এর কাজ শুরু করা হবে।

September 6, 2009

সাইফুর রহমান আর নেই - মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত

বাংলাদেশের রাজনীতি অঙ্গনের বর্ষীয়ান নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য এম সাইফুর রহমান আর নেই। গতকাল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা গেছেন (ইন্নালিল্লাহে .... রাজিউন)।

তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সাইফুর রহমানের মৃত্যুর কারণে বেগম জিয়া গতকাল তার সব কর্মসূচি স্থগিত করেন।সাইফুর রহমানের বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। আজ দুপুর সাড়ে ১২টায় তার মরদেহ নয়া পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে আনা হবে এবং সেখানে অনুষ্ঠিত হবে প্রথম জানাজা। এরপর বেলা আড়াইটায় দ্বিতীয় দফা জানাজা হবে সংসদ প্লাজায়। এরপর গুলশানের আজাদ মসজিদে বাদ আসর তৃতীয় জানাজা শেষে তার মরদেহ মৌলভীবাজারের উদ্দেশে নেয়া হবে। আগামীকাল সোমবার পারিবারিক কবরস্থানে স্ত্রীর কবরের পাশে সাইফুর রহমানের মরদেহ দাফন করা হবে।

সাইফুর রহমান তার নির্বাচনী এলাকা মৌলভীবাজার থেকে ঢাকায় ফেরার পথে গতকাল দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের খড়িয়ালা নামক স্থানে সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। সাইফুর রহমানের গাড়িটি বেলা আড়াইটার দিকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের খাদে পড়ে যায়। এতে সাইফুর রহমান গুরুতর আহত হন। সংবাদ পেয়ে র‌্যাব-৯-এর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সাইফুর রহমান ও অপর ৪ জনকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক সাইফুর রহমানকে মৃত ঘোষণা করেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, দুর্ঘটনায় সাইফুর রহমানের সঙ্গে থাকা শামছুল হক (৪০), সজীব মিয়া (২৫), শরীফ আহমেদ (২৬) ও সিরাজুল ইসলাম (২৮) আহত হন। তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

সাইফুর রহমানের মৃত্যুর খবর পেয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকরা ভিড় জমান। স্থানীয় বিএনপির নেতারা ছাড়াও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও হাসপাতালে ছুটে যান। ভিড় সামলাতে হাসপাতালে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হয়।

বিকেল ৫টায় সাইফুর রহমানের ছেলে কাউছার রহমানসহ নেতাকর্মীরা এম্বুলেন্সে করে লাশ ঢাকায় নিয়ে আসেন। রাত পৌনে ৮টায় সাইফুর রহমানের লাশ তার গুলশানের বাসভবন জালালাবাদ হাউজে আনার পর শোকবিহ্বল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। সাইফুর রহমানের পরিবারের সদস্য ছাড়াও তার রাজনৈতিক শুভানুধ্যায়ীরা একে একে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। রাত পৌনে ৯টায় বেগম খালেদা জিয়া যান জালালাবাদ হাউজে। খালেদা জিয়া সেখানে পেঁৗছালে এক বেদনাবিধুর পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তিনি বাসার ভেতরে রাখা সাইফুর রহমানের কফিনের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নীরবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে মরহুমের মেজ ও ছোট ছেলেমেয়েদের সাত্ত্বনা দেন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, এম শামসুল ইসলাম, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আ স ম হান্নান শাহ, সাবেক মন্ত্রী চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফসহ দলের কেন্দ্রীয়, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদও সেখানে যান।

এর আগে সাইফুর রহমানের বাসায় যান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু। তারা মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।

আজকের কর্মসূচি : সাইফুর রহমানের প্রথম জানাজা হবে দুপুর সাড়ে ১২টায় নয়া পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এবং এরপর বেলা আড়াইটায় দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে সংসদ প্লাজায়। বাদ আসর তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে গুলশানের আজাদ মসজিদে, এরপর সাইফুর রহমানের মরদেহ তার গ্রামের বাড়ি মৌলভীবাজার নিয়ে যাওয়া হবে।

বর্ণাঢ্য জীবন

বাংলাদেশের রাজনীতি অঙ্গনের বর্ষীয়ান নেতা সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপি স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য এম সাইফুর রহমান বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি জাতীয় সংসদে মোট ১২ বার বাজেট পেশ করেন।

তার জন্ম ১৯৩২ সালের মার্চে মৌলভীবাজার সদরের বাহারমর্দন গ্রামে। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেন তিনি। এরপর লন্ডনে চার্টার্ড একাউন্টেন্সির ওপর উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।

পেশায় চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট সাইফুর রহমান বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে রাজনীতিতে যুক্ত হন। জিয়ার মন্ত্র্রিসভায় প্রথমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং পরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সাইফুর রহমান। এরপর বিএনপি যতদিন ক্ষমতায় ছিল, সাইফুর রহমানই অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চারবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিগত সংসদ নির্বাচনেও সিলেট-১ ও মৌলভীবাজার-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময় তিনি দেশে মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) চালু করেন।

এম সাইফুর রহমান ১৯৭৬-৮২, ১৯৯১-৯৬ ও ২০০১-২০০৬ সালে সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিভিন্ন সময় অর্থ, পরিকল্পনা, বাণিজ্য ও বৈদেশিক বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কমিটির সভাপতি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখেন।

সাইফুর রহমান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের বোর্ড অফ গভর্নেন্সের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন। ১৯৯৪ সালে অক্টোবরে মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সম্মেলনে তিনি সভাপতিত্ব করেন।

১৯৮০-৮২, ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে সাইফুর রহমান বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফডিতে বাংলাদেশের গভর্নর ছিলেন। এছাড়া ইইসি, এসকাপ, কমনওয়েলথ, বিশ্বব্যাংকে বাংলাদেশের অর্থ ও বাণিজ্য বিষয়ক প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন তিনি।

১৯৯৫ সালে কলম্বিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এছাড়া এই একই বছরে বসনিয়ায় অনুষ্ঠিত ওআইসি সম্মেলনেও তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান ছিলেন।

১৯৫৮ সালে লন্ডন থেকে চার্টার্ড একাউন্ট্যান্সিতে ডিগ্রি লাভ এবং ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্যে এডভান্সড ম্যানেজমেন্টে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন তিনি।

ছাত্রজীবনে বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ও আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ঢাকা মুসলিম হলের সভাপতি থাকাকালে ১৯৫২ সালের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন ও কারাবরণ করেন।

১৯৭৪ সালে বুখারেস্টে অনুষ্ঠিত বিশ্বস্বাস্থ্য সম্মেলনে জাতিসংঘ সমিতির বিশ্ব ফেডারেশন প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন।

১৯৭৭-'৭৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে তিনি যোগদান করেন।

১৯৭৮ সালে জেনেভায় অনুষ্ঠিত আঙ্কটাড সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

তিনি ঢাকা-উত্তর রোটারি ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

সদস্য ছিলেন অধুনালুপ্ত জাগদলের, বিশেষ করে সিলেটে পার্টি সংগঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন তিনি। বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সাইফুর রহমান ১৯৭৬ সালে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৭৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী নিযুক্ত হন।

সাইফুর রহমানের বড় ছেলে নাসের রহমানও সাবেক সাংসদ। নাসের ছাড়াও সাইফুর রহমানের আরও দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছেন।

প্রসঙ্গত, ১/১১ প্রেক্ষাপটে সাইফুর রহমান বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ওপর অনাস্থা প্রকাশ করে সংস্কার প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দেন। ২০০৭ সালের ২৯ অক্টোবর নিজ বাসভবনে দলের গঠনতন্ত্র অমান্য করে স্থায়ী কমিটির সভার মাধ্যমে নিজেই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খালেদা জিয়ার কাছে দুঃখ প্রকাশ করে তার নেতৃত্বের ওপর আস্থা প্রকাশ করেন তিনি। বয়স ও শারীরিক অবস্থার কারণে সম্প্রতি রাজনীতি থেকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সাইফুর রহমান; কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে তার অবসরের সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করা হয়নি।

জাতীয় নেতৃবৃন্দের শোক প্রকাশ

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক অর্থমন্ত্রী বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এম সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ও অর্থমন্ত্রী এমএ মুহিতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। গতকাল পৃথক শোকবার্তায় মরহুমের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন তারা।

গতকাল এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান বলেন, সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে দেশ একজন প্রবীণ রাজনীতিককে হারাল। শোকবার্তায় তিনি মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করে পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করেন।

বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া শোকবার্তায় বলেন, এম সাইফুর রহমানের দূরদর্শী চিন্তা ও পরিকল্পনা এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও তার অবদান অপরিসীম। তার মৃত্যুতে জাতীয় অর্থনীতি এবং রাজনীতির ক্ষেত্রে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা পূরণ হওয়ার নয়। সাইফুর রহমানের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।

সড়ক দুর্ঘটনায় সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা এম সাইফুর রহমানের আকস্মিক মৃত্যুতে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় সাইফুর রহমানকে বিএনপির একজন ত্যাগী নেতা হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে জাতি একজন দেশপ্রেমিক নেতাকে হারাল এবং এটা জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখায় জাতি তাকে স্মরণ করবে। মন্ত্রী শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং রুহের মাগফেরাত কামনা করেন।

সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে জাতীয় সংসদের স্পিকার এডভোকেট আবদুল হামিদ ও ডেপুটি স্পিকার লে. কর্নেল (অব.) শওকত আলী শোক প্রকাশ করেছেন। স্পিকার আবদুল হামিদ এক শোকবার্তায় বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ এক বরেণ্য নেতাকে হারাল। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও দেশের উন্নয়নে সাইফুর রহমানের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। এক শোকবার্তায় তিনি মরহুমের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ অন্য এক শোকবার্তায় সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাশেম এক যৌথ বিবৃতিতে সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন। বিবৃতিতে মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন তারা ।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি ও সাধারণ সম্পাদক বিমল বিশ্বাস সাবেক অর্থমন্ত্রীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

এছাড়াও স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, বিএনপি মহাসচিব এডভোকেট খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের (পিডিপি) চেয়ারম্যান ড. ফেরদৌস আহমেদ কোরেশী, ইসলামী ঐক্য জোটের চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান চৌধুরী, গণতন্ত্রী পার্টির সভাপতি মোহাম্মদ অফজাল ও সাধারণ সম্পাদক নুরুর রহমান সেলিম, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের নেত্রী এডভোকেট তারানা হালিমসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা পৃথক শোক বার্তায় সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।

মৌলভীবাজারে তিন দিনের শোক

সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের মৃত্যুতে মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি গতকাল শনিবার থেকে সংগঠনের পক্ষ থেকে ৩ দিনব্যাপী শোক পালন ও কালোব্যাজ ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এ অঞ্চল হারালো সবচেয়ে সক্ষম এক নেতাকে: মনমোহন সিং
সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বিএনপির প্রবীণ নেতা সাইফুর রহমানের মর্মান্তিক মৃতু্যতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং। গতকাল প্রয়াত সাইফুর রহমানের পুত্র নাসের রহমানকে পাঠানো এক শোকবার্তায় তিনি শোকাহত পরিবার পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সহমর্মিতা জানান। তিনি বলেন, সাইফুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের নামী রাজনীতিবিদদের একজন। তিনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে শুধু সফল ছিলেন না, একজন প্রজ্ঞাবান দেশনেতাও ছিলেন। মনমোহন সিং আরও বলেন, সাইফুর রহমান বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আধুনিকতার পথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এদেশের অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার সংস্কার বহুদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় পথ দেখিয়েছে। কারণ ৯০ দশকের শুরুতে তিনিই ছিলেন দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রবর্তক। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার মৃতু্যতে বাংলাদেশ একজন সৎ দেশপ্রেমিককে হারালো। তিনি ছিলেন একজন নিঃস্বার্থ দূরদর্শী নেতা। তিনি আরও বলেন, আমরা দু'জনেই দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও সমৃদ্ধিতে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করতাম। আমি তার পরামর্শকে সবসময়েই বিশেষ করে মূল্যায়ন করি। তার মৃতু্যতে আমি এক পুরনো বন্ধুকে হারালাম আর এ অঞ্চল হারালো তার সবচেয়ে সক্ষম এক নেতাকে। মনমোহন সিং শোকবার্তায় সর্বশক্তিমানের কাছে তার বন্ধুর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন।

September 2, 2009

চন্দ্র অভিযান বানোয়াট - সায় দিলেন নিল আর্মস্ট্রং


চন্দ্র অভিযান মিথ্যে ও বানোয়াট। দীর্ঘদিন এমন বিতর্ক চলার পর এবার তাতে সায় দিয়েছেন চন্দ্র অভিযানের মূল নায়ক নিল আর্মস্ট্রং। ১৯৬৯ সালের ২০শে জুলাই তিনিই প্রথম চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিলেন। তিনিই বললেন, তাকে এবং সহযোগী নভোচারীদের দিয়ে সম্ভবত নিউ মেক্সিকোর কোন ধ্বনিমঞ্চ (সাউন্ডস্টেজ)-এ চিত্রায়িত হয়ে থাকতে পারে চন্দ্র জয়ের ওই দৃশ্য। অনলাইন দ্য ওনিয়ন ডট কম (www.theonion.com) এ খবর দিয়ে আরও জানায়- সোমবার নিজ বাড়িতে এক সংবাদ সম্মেলনে আর্মস্ট্রং চন্দ্র অভিযান নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কে তার সায় দেন। এ সময় তিনি চন্দ্রপৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে দেয়া তার বিখ্যাত উক্তি- 'ওয়ান স্মল স্টেপ ফর ম্যান, ওয়ান জায়ান্ট লিপ ফর ম্যানকাইন্ড'কে পাল্টে তিনি বলেন, এটা হওয়া উচিত ছিল- ওয়ান স্মল স্টেপ ফর ম্যান, ওয়ান জায়ান্ট লাই ফর ম্যানকাইন্ড। অর্থাৎ চন্দ্রপৃষ্ঠে মানুষের ছোট্ট পদচিহ্ন, মানবজাতির জন্য ভয়ঙ্কর মিথ্যা। ওই সংবাদ সম্মেলনে নিল আর্মস্ট্রং জানান, চন্দ্র অভিযানের ভিডিও ইউটিউবে দেখেছেন এবং চন্দ্র অভিযান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টিকারী রাফ কোলম্যানের ওয়েবসাইট ওমিশন কন্ট্রোল ডট অর্গ-এর বেশ কিছু ব্লগ পড়েছেন তিনি। বলেছেন, এগুলো দেখে ও পড়ে আমার মনে হয় আমি মিথ্যের সঙ্গে বসবাস করছি। আমার কাছে এটা বেদনাদায়ক এ জন্য যে, ১৯৬৯ সালের ২০শে জুলাই আমি ও আমার সহযোগীরা আট দিনে ২ লাখ ৫০ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে চাঁদের মাটি স্পর্শ করিনি। সেখানে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে তা-ও খাঁটি নয়। এর মাধ্যমে মানবজাতির সামনে কোন নতুন যুগ উন্মুক্ত হয়নি। বস্তুত চন্দ্র অভিযানের পুরো ঘটনা খুব সম্ভব নিউ মেক্সিকোর কোন এক জায়গায় এক সাউন্ড স্টেজে চিত্রায়িত হয়েছে। প্রায় ৪০ বছর আগে মহাকাশ গবেষণায় যখন রাশিয়া অনেকখানি এগিয়ে যায়, প্রথমে পশু ও পরে মানুষ মহাশূন্যে পাঠাতে সক্ষম হয় তখনই যুক্তরাষ্ট্র এ লড়াইয়ে জিততে উঠেপড়ে লাগে। এক পর্যায়ে তারা নিল আর্মস্ট্র, এডউইন অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্সকে পাঠায় চাঁদে। তাদের মধ্যে চাঁদের মাটিতে প্রথম পা রাখেন নিল আর্মস্ট্রং, পরে এডউইন অলড্রিন। মাইকেল কলিন্স রয়ে যান তাদেরকে বহনকারী নভোতরীর নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্য দিয়ে মহাশূন্য গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র নেতৃস্থানীয় হয়ে ওঠে। কিন্তু আর্মস্ট্রং স্বীকার করেন- তিনি এবং এডউইন অলড্রিন চাঁদের বুকে যুক্তরাষ্ট্রের যে পতাকা উড্ডয়ন করেছিলেন তা কিছুটা নড়াচড়া করছিল এমনটা বলতে তিনি ভুল করেছেন। আর্মস্ট্রং বলেন- চাঁদ, যা বায়ুশূন্য সেখানে পতাকা নড়াচড়া সে তো একেবারে অসম্ভব। আসলে কোন এয়ারকন্ডিশনের বাতাসে নড়েছে পতাকা। আর আমাদেরকে যে হেলমেট পরানো হয়েছিল তাতে বাইরের কোন শব্দই শোনা যায় না। এরপরই আর্মস্ট্রং সুভ্যেনির হিসেবে রাখা চাঁদের মাটির কিছু নমুনা মুঠো করে ধরেন এবং তা ফেলে দেন ময়লার ঝুড়িতে। ওদিকে রাফ কোলম্যানের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ১৯৬৯ সালে মানুষকে চাঁদে পাঠানোর মতো বাস্তব প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ছিল না যুক্তরাষ্ট্রের। বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ এবং পাইলটদের অধীনে ঐতিহাসিক ওই মিশনের জন্য নভোচারীদের হাজার হাজার ঘণ্টা প্রশিক্ষণ দেয়া সত্ত্বেও আর্মস্ট্রং স্বীকার করেছেন- চন্দ্র অভিযান নিয়ে বিতর্কিত তত্ত্বই সঠিক। এক ও অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা'র কয়েক হাজার কর্মকর্তা ঘণ্টার পর ঘণ্টা একত্রে কাজ করছিলেন। কিন্তু তাদের কেউ কি জানতেন আসলে কি হচ্ছিল। ৩১ বছর বয়সী পার্টটাইম ভিত্তিতে কর্মরত সহকারী লাইব্রেরিয়ান রাফ কোলম্যান সম্পর্কে আর্মস্ট্রং বলেছেন- আমি যতটুকু জানি তার চেয়ে চন্দ্র অভিযানের ধোঁকা সম্পর্কে বেশি জানেন কোলম্যান। বছরের পর বছর তিনি এ বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করছেন। ওমিশন কন্ট্রোল ডট অর্গ আরও জানিয়েছে, আর্মস্ট্রং চাঁদের যেখানে অবতরণ করেছিলেন তার পাশেই ইংরেজি 'সি' অক্ষর খোদিত একটি পাথর খণ্ড পড়ে ছিল। আর্মস্ট্রং এ বিষয়টি অভিযানের আগে-পরে উল্লেখ করেননি। আবেগপ্রবণ আর্মস্ট্রং এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ওই পাথরখণ্ডটি সম্ভবত নাসা থেকে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পাথরখণ্ডটি আর্মস্ট্রং উল্টে দিতে ভুলে গিয়েছিলেন। কেন এমন ধোঁকাবাজি? এ রকম প্রশ্নের জবাবে আর্মস্ট্রং-এর উদ্ধৃতি দিয়ে কোলম্যান বলেছেন- তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নকে মহাশূন্য অভিযানে পেছনে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্র ওই ঘটনা সাজিয়েছিল। সংবাদ সম্মেলনে আর্মস্ট্রং চাঁদে তার প্রথম পা রাখার দৃশ্য প্রদর্শন করেন। কয়েকবার বিভিন্ন গতিতে ওই দৃশ্যের ফিল্ম প্রদর্শন করে তিনি বলেন- চাঁদের বুকে মানবজাতির পা রাখার ঘটনা চিত্রায়ন ছাড়া কিছু নয়। এতে প্রথমে তাকে পিছন দিকে ধীরগতিতে পিছাতে বলা হয়। পরে তা বিপরীত দিকে চালিয়ে দেয়া হয়- যা দেখে মানুষ মনে করে তিনি চাঁদের গায়ে হাঁটছেন। আর্মস্ট্রং বলেন- এ দৃশ্যের মধ্যেই সব। চোখ খোলা রাখলে তা ধরা পড়বে। প্রকৃতপক্ষেই তা চাঁদের গায়ে ছোট পদচিহ্ন, কিন্তু বাস্তবে তা মানবজাতির জন্য ভয়ঙ্কর এক মিথ্যে।

September 1, 2009

ডিম আমদানি কি ঠিক হল?

এক রকমের আকস্মিকভাবেই সরকার ভারত থেকে মুরগির ডিম আমদানি শুরু করেছে। গত মাসখানেক সময় ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রান্তিক খামারিরা পোলট্রি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধিসহ নানা সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল ভারত থেকে ডিম আমদানি। এ ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে দেশের অসংখ্যা পোলট্রি খামারি। এক অনিশ্চয়তার আতংক ছড়িয়ে পড়েছে তাদের মধ্যে। হঠাৎ করে কি এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হল যে ভারত থেকে ডিম আমদানি করতে হবে, এ প্রশ্ন এখন বিভিন্ন মহলের। হতাশ হলাম আমিও। কারণ এই শিল্পের উত্থানের প্রত্যেকটি ধাপের প্রত্যক্ষদর্শী আমি। শুধু প্রত্যক্ষদর্শীই নয়, শুরু থেকে এ পর্যন্ত এই শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকতে পেরেছি। গতকাল এই লেখাটি যখন লিখছি তখন অনেক খামারির সঙ্গেই আমার কথা হচ্ছে। তাদের দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করা ছাড়া কিছুই করার নেই আমার।

বলা বাহুল্য, জনসংখ্যা তখন কম ছিল। সাধারণের মধ্যে খাদ্য ও পুষ্টি তথা আমিষের চাহিদা পূরণ সম্পর্কে সচেতনতাও ছিল কম। মুরগির মাংস কিংবা ডিম কোন কিছুই এখনকার মতো এত সহজপ্রাপ্য ছিল না। গৃহস্থ বাড়িতে হাঁস-মুরগি পোষা হতো পারিবারিক প্রয়োজনে। আশির দশকে এলো খাঁচায় মুরগি পালনের ধারণা। সাদা লেগহর্ন, রোড আইল্যান্ড রেড, পাইমাউথ রক, ওয়াইন ডট জাতের মুরগি বাংলাদেশে সৃষ্টি করে এক বিস্ময়। একটি মুরগি একটানা ২৩০টি ডিম দিতে পারে কিংবা একটি মুরগি ৪ থেকে ৬ মাসে হতে পারে ২ থেকে ৪ কেজি মাংসের নিয়ামক- এই ধারণাগুলো কারও কারও কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকে। পরীক্ষামূলকভাবে ক্ষুদ্র পরিসরে অনেকেই খামার গড়ে অল্পদিনেই পেয়ে যায় সাফল্যের সন্ধান। এ যেন হাঁসের সোনার ডিম কিংবা আলাদিনের চেরাগ হাতে পাওয়ার মতো ব্যাপার। কেউ কেউ গোপন রাখেন এই সাফল্য। অনেকে গলা বাড়িয়ে বললেও মুরগির খামার গড়ার বিষয়টি সহজে গ্রহণযোগ্য হয়নি সে সময়। গণমাধ্যমের কল্যাণেই খামারে মুরগি পালনের ধারণাটি গ্রাম থেকে শুরু করে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়তে থাকে। খামারে বা খাঁচায় মুরগি পালনের বিষয়টি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে দারুণ সম্ভাবনাময় বিবেচনায় সরকারও আন্তরিকতা নিয়ে এগিয়ে আসে। বিশেষ করে জেলায় জেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পূর্বের কোর্স কারিকুলামের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত করা হয় হাঁস-মুরগি পালন ও মৎস্যচাষকে। এমনকি যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে বিশেষ ঋণ প্রদানের ব্যবস্থাও চালু করা হয়। সরকারের আন্তরিকতা, গণমাধ্যমের লাগাতার প্রয়াস সবকিছুর কল্যাণেই নব্বই-পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে দারুণ এক সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যায় পোলট্রি শিল্প। এর মধ্য দিয়ে দেশে যখন মুরগির মাংস আর ডিমের চাহিদা বাড়তে থাকে, তখন সরকার না বুঝে ভারত থেকে ডিম আমদানির এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। বিভিন্ন সীমান্তপথে দেদারছে মুরগির ডিমের সঙ্গে দেশে কচ্ছপের ডিমও ঢুকতে শুরু করে। যা হয়তো অনেকেরই মনে আছে। দেশের মানুষের কাছে তখন দেশী মুরগির ডিম আর খামারের মুরগির ডিমের তফাৎ বোঝাই কষ্টকর, তখন কোনটি মুরগির ডিম আর কোনটি কাছিমের ডিম তা বোঝার মোটেও উপায় ছিল না। কিন্তু বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ায় একদিকে মানুষ বিভিন্ন রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হতে থাকে, অন্যদিকে দেশীয় বিকাশমান পোলট্রি শিল্পও পেঁৗছে যায় ক্ষতির মুখে। পোলট্রি শিল্পের ক্ষতি ঠেকাতেই সরকার একসময় ভারত থেকে খাবার ডিম আমদানি বন্ধ করে শুধু 'হ্যাচিং এগ' বা বাচ্চা ফোটানোর ডিম আমদানির পথ খোলা রাখে। কিন্তু দেখা যায় সীমান্তপথ দিয়ে ব্যবসায়ীরা 'হ্যাচিং এগ'-এর সঙ্গে দেদারছে 'টেবিল এগ' বা খাওয়ার ডিমও ঢুকে পড়ছে। পরে সরকার হ্যাচিং এগ আমদানিও বন্ধ করে দেয়। কারণ সরকারের তখন স্থানীয় শিল্প উন্নয়নের জোরালো তাগিদ ছিল। সেই সময়টি ছিল পোলট্রি শিল্প বিকাশের প্রারম্ভিক অধ্যায়। তারপর কেটে গেছে ১৬টি বছর। এর মধ্যে লাখ লাখ মানুষ সম্পৃক্ত হয়েছে এই শিল্পের সঙ্গে। ক্ষুদ্র বিনিয়োগ থেকে শুরু করে এক সময় বড় বড় উদ্যোক্তার বিনিয়োগ জমা হয়েছে পোলট্রি খামারে। অসংখ্য গৃহিণীর কষ্টার্জিত বিনিয়োগ, বেকার তরুণের সম্বল ইত্যাদি যুক্ত হতে হতে তিল তিল করে বিশাল একটি শিল্পে পরিণত হয় পোলট্রি শিল্প। একদিন যে শিল্পের মূল্যমান দাঁড়িয়ে যায় ১০ হাজার কোটি টাকা। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা। কৃষির অন্যতম এক উপখাত হিসেবে জিডিপিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে থাকে পোলট্রি শিল্প। একইভাবে দেশে আমিষের ঘাটতি পূরণে সবচেয়ে বেশি ভূমিকার দাবিদার হয়ে দাঁড়ায় মুরগির মাংস ও ডিম। আর এই পর্যায়ে আসতে পোলট্রি শিল্পকে পার করতে হয়েছে একের পর এক বহু প্রতিকূলতা ও বিপর্যয়। শিল্প বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়েছে পোলট্রি উপকরণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। গড়ে ওঠে পোলট্রি খাদ্য ইন্ডাস্ট্রি, ব্যাপক প্রসার ঘটে ভ্যাকসিন ও ওষুধের বাণিজ্যের, গড়ে ওঠে একের পর এক হ্যাচারি। সব মিলিয়ে সমন্বিত এক বিশালাকার শিল্পে পরিণত হওয়ার পর পরই পোলট্রি শিল্প বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গেই মানুষসৃষ্ট দুর্যোগের শিকার হতে থাকে। কখনও এ বিপর্যয় হাজার হাজার খামারিকে পথে বসিয়েছে, কখনও এ বিপর্যয় দেশে আমিষের নিশ্চয়তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। আবার পৃথিবীর অনেক দেশের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালে বার্ড ফ্লু যখন প্রথম গুজব হিসেবে এদেশে ঢোকে তখনও এই শিল্প মারাত্মক ক্ষতির শিকার হয়। ২০০৫ সালেও আবার প্রবেশ করে বার্ড ফ্লু গুজব। আর ২০০৬ সালে একদিকে প্রলম্বিত বন্যা, অন্যদিকে সত্যি সত্যিই বার্ড ফ্লুর অক্রমণ, পোলট্রি শিল্পকে একেবারে ধরাশায়ী করে ফেলে। পর পর দুই বছর বার্ড ফ্লুতে এই শিল্পের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫ হাজার কোটি টাকার ওপরে। দেড় লাখ খামারের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার খামার বন্ধ হয়ে যায়। এমন একটি বিপর্যয়ের পর যেসব খামারি টিকে ছিল, আবার নতুন করে যারা সর্বস্ব বিনিয়োগ করে এই শিল্প নিয়ে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা করেছে তারাও পড়েছে সমূহ বিপদের মুখে।

একেবারে সামপ্রতিক চিত্র তুলে ধরছি। বাজারে মুরগির ডিমের দাম বাড়ছে, সরকার উদ্বিগ্ন হচ্ছে। দাম কমানোর জন্য দিচ্ছে কড়া তাগিদ। এরই মধ্যে পোলট্রি খামারিরা জানালেন তাদের উৎপাদন চিত্র। বর্তমানে হ্যাচারিতে একদিন বয়সী ব্রয়লার মুরগির বাচ্চার দাম ৫০ টাকা। সেটি মধ্যস্বত্বভোগীর হাত হয়ে খামারিদের কাছে পেঁৗছায় কমপক্ষে ৫৫ টাকায়। ৩৫ দিনে একটি ব্রয়লার বাজারজাত উপযোগী হয়। এই ৩৫ দিনে একটি মুরগির নূ্যনতম খাদ্য প্রয়োজন হয় ৩ কেজি। ২৮ টাকা প্রতিকেজি খাদ্য হিসেবে ৩ কেজির বাজারমূল্য দাঁড়ায় ৮৪ টাকা। ভ্যাকসিন, ওষুধ, হ্যাচারি থেকে বাচ্চা পরিবহনসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় প্রতি মুরগিতে ১২ টাকা, খামারের বিদু্যৎ ও শ্রমিক খরচ নিম্নপক্ষে ৫ টাকা। এর বাইরেও রয়েছে শতকরা ৫ ভাগ মৃতু্যহারের হিসাব। সব মিলিয়ে ৩৫ দিন বয়সী দেড় কেজি ওজনের একটি ব্রয়লার মুরগির পেছনে খামারে ব্যয় হয় কমপক্ষে ১৫৬ টাকা। খামারি পর্যায়ে বর্তমান ব্রয়লার মুরগির বাজার দর ৯০ টাকা কেজি। অর্থাৎ দেড় কেজি ওজনের মুরগির দাম ১৩৫ টাকা। অর্থাৎ প্রতি মুরগিতে খামারিদের লোকসান দাঁড়াচ্ছে ২১ টাকা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খামারিরাই তাদের এই দুরবস্থার কথা জানিয়েছেন। অসম বাজার ব্যবস্থার কারণে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন। খামারিরা বলছেন, এই দুরবস্থার শিকার শুধু তারাই। প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই একটি সুবিধাভোগী মধ্যস্বত্বভোগী চক্র এত বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে যে কোনভাবেই তারা সরাসরি কোন বাজার সহায়তা পাচ্ছে না। এমনিতেই হ্যাচারি পর্যায়ে একদিনের বাচ্চার দাম বাড়তে বাড়তে তিন গুণে পেঁৗছেছে, তার ওপর মধ্যস্বত্বভোগীর মুনাফা উপার্জনের শিকার হতে হচ্ছে খামারিদের। পোলট্রি খাদ্য কেনার ক্ষেত্রেও রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীর একই দৌরাত্ম্য। প্রশ্ন হচ্ছে একদিনের বাচ্চার দাম কেন ৫০-৫৫ টাকা হবে? ১০ বছরে এই ডে ওল্ড চিকসের দাম ৫ থেকে ১০ গুণ বৃদ্ধির কোন কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। আমার জানা মতে, বর্তমান দুমর্ূল্যের বাজারেও একদিনের বাচ্চা উৎপাদনের ব্যয় ১২ থেকে ১৫ টাকার বেশি নয়। পোলট্রি ব্রিডার্স এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বললেন, ডে ওল্ড চিকস্ লেয়ারের উৎপাদন খরচ ২৫ টাকা আর ব্রয়লার বাচ্চার খরচ ৩২ টাকা। তার হিসাবটি ধরলেও প্রতি বাচ্চায় ২০ থেকে ২৫ টাকা লাভ সত্যিই বিস্ময়করই বটে। পোলট্রি শিল্পের উত্থান আমার চোখে দেখা। আজ যারা হ্যাচারি ইন্ডাস্ট্রির মালিক হয়েছেন একসময় তাদের অসামান্য অবদান ছিল এই খাতে। কিন্তু আজ যখন দেশের লাখ লাখ খামারি তাদের প্রধান বিপণন ক্ষেত্র, তাদের কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকা মুনাফা করছেন কোন বিবেকে তা সত্যিই প্রশ্নসাপেক্ষ? দেশে ৪০ থেকে ৫০টি ছোট-বড় হ্যাচারির মধ্যে নেতৃস্থানীয় ৫-৬টি হ্যাচারি মালিকদের খামখেয়ালিপনা ও অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চিন্তাভাবনা এই শিল্পকে আবারও দাঁড় করাচ্ছে ধ্বংসের দোরগোড়ায়। এখানেও সেই ধনীর দৌরাত্ম্য ও সুবিধা আদায়ের চিত্রই দেখা যায়। এই হ্যাচারি মালিকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের ইকু্যইটি ইন্টারেস্ট ফান্ড বা ইইএফ ফান্ডের সুযোগও গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে খামারিদের কোন সুযোগের জায়গা নেই। তারা ভাগ্যে শুধু বিপর্যয় আর বঞ্চনা। দুর্ভাগ্যজনক হল সরকার বাজারে মুরগির মাংস বা ডিমের দাম কেন বাড়ছে এর উত্তর খুঁজতে গোড়ায় না গিয়ে, এর সমাধান হিসেবে ডিম আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় শিল্পকেই পঙ্গু করে ফেলতে পারে এই ভাবনাটি ভাবাই হয়নি। ডিম কিংবা মুরগির মাংসের দাম বাড়লে সহজ হিসাব উৎপাদন খরচ কমাতে হবে, উৎপাদন খরচ কমাতে হলে উপকরণের মূল্য কমাতে হবে। এগুলো সবই তো শিল্প অভ্যন্তরের সমস্যা। আমদানি করে দেশবাসীকে খাওয়ালে তো সমস্যার সমাধান হল না, বরং নিজের সক্ষমতা হারিয়ে পরনির্ভরশীলতার বীজ বোনা হল।

খোঁজ-খবর নিয়ে জানলাম, জিএম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ভারত থেকে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮৮০টি ডিম প্রথম চালান হিসেবে আমদানি করেছে। সরকার এরকম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সর্বমোট ১০ কোটি ডিম ভারত থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অথচ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের গত ১২ আগস্ট তারিখে জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে দেখা যাচ্ছে, বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জামুক্ত দেশ থেকে ডিম আমদানি করিতে হবে, আমদানিতব্য প্রতিটি চালানের জন্য রফতানিকারক দেশের পশুসম্পদ বিভাগ বা সরকার নির্ধারিত উপযুক্ত কতর্ৃপক্ষ কতর্ৃক এই মর্মে প্রত্যয়নপত্র থাকিতে হবে যে, আমদানি চালানে ডিম এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, বার্ড ফ্লু, ভাইরাস ও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ামুক্ত।

বিশ্ব পশু স্বাস্থ্য সংস্থা ও আইই'র রিপোর্ট হচ্ছে বর্তমান সময়ে ৯টি দেশে বার্ড ফ্লুর অস্তিত্ব বিদ্যমান। এর মধ্যে একটি দেশ হচ্ছে ভারত। বাংলাদেশের চারদিকে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পোলট্রির বার্ড ফ্লু রয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওই প্রজ্ঞাপন যদি মানা হয় তাহলে ভারত থেকে ডিম আমদানির কোন কারণ নেই, এবং ভারতের বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেই যে ওই প্রজ্ঞাপন তৈরি করা হয়েছে তাও স্পষ্ট বোঝা যায়। অন্যদিকে মুরগি, ডিম বা ডে ওল্ড চিকস্ আমদানির ক্ষেত্রেও বিশ্ব পশু স্বাস্থ্য সংস্থার কোড অনুযায়ী আমদানির সময় প্রতিটি ব্যাচ টেস্ট করতে হয় অথচ সীমান্তে কোন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ডিম আমদানি করা হচ্ছে। পরীক্ষারও কোন ব্যবস্থা সেখানে নেই। অন্যদিকে দেশে বর্তমানে কোন স্থলপথে ডিম বা একদিনের বাচ্চা আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রয়েছে। কেবল আকাশপথে প্যারেন্ট স্টক আনার বিধান রয়েছে। অথচ স্থলপথে কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ডিম আমদানির মধ্য দিয়ে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে যাচ্ছে দেশ।

সরকারি মহল সম্ভবত জেনে থাকবে, ভারত সরকার ৩০ ভাগ ভর্তুকি দিয়ে বাংলাদেশে ডিম রফতানি করছে। তারা ভারতীয় মূল্যের চেয়ে কম মূল্যে এদেশে ডিম পাঠানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে এদেশের স্থানীয় শিল্প ধ্বংস করা ও বাজার দখল করা। তাদের সে পরিকল্পনা অনেকটাই সাফল্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলেই অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়। কিছুদিন আগে শুধু বাইরে থেকে কম দামে গুঁড়ো দুধ আমদানির জের হিসেবে দেশের বিভিন্ন এলাকার দুগ্ধ খামারিরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। হাজার হাজার খামারি পথে নেমে শত শত লিটার দুধ ঢেলে নষ্ট করে এর প্রতিবাদ জানান। শুধুই তাদের আকুতি ছিল, দুগ্ধশিল্প রক্ষার। যদিও দুধের ক্ষেত্রে ৯০ ভাগই আমরা আমদানিনির্ভর। আর ডিম কিংবা মুরগির মাংস অন্যতম একটি শিল্প যেখানে আমরা পুরোপুরিই স্বয়ম্ভর। আমাদের নিজস্ব শিল্পই পূরণ করছে ১৫ কোটি মানুষের চাহিদা। এর মধ্যে ডিম আমদানির এই যে উদ্যোগ তা এ শিল্পের জন্য যেমন হতে পারে আত্মঘাতী, একইভাবে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান সবক্ষেত্রেই হতে পারে বিপর্যয়কর। শেষে একটু মনে করিয়ে দেই, এ বছর জাতীয় বাজেটের আগে সিরাজগঞ্জে কৃষকদের নিয়ে বাজেট আলোচনা করছিলাম। ওই অনুষ্ঠানে খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন। সেখানে একজন পোলট্রি খামারি বললেন, সরকার যদি পোলট্রি শিল্পের জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেয় তাহলে দেশের বেকার জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের কর্মসংস্থান হতে পারে পোলট্রি শিল্প। পোলট্রি খামারিরা একথা বিশ্বাস করেন মনেপ্রাণে। কারণ এই শিল্পের সঙ্গে সঙ্গেই আত্মবিশ্বাস তাদের হাতে গড়া। কিন্তু সরকারের ডিম আমদানির সিদ্ধান্ত শত বিপদের পরেও দাঁড়িয়ে থাকা পোলট্রি খামারিদের জন্য দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিছুই নয়।

আমি বিষয়গুলো আমার অনুষ্ঠানে সংবাদে বারবার বলেছি, খামারিরাও বলেছেন, দেশে যখন ভোক্তাপর্যায়ে কোন কিছুর দাম বাড়ে তখন সরকার ব্যস্ত হয়ে যায়। কিন্তু দাম বাড়ার প্রকৃত কারণ কখনও অনুসন্ধান করা হয় না। পাশাপাশি কৃষি বা খামার সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলোর উৎপাদন পর্যায়ের খোঁজ মোটেই নেয়া হয় না, নেয়া হয় না পণ্যের উৎপাদন মূল্য কমিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ। যেমনটি করা হয়নি পোলট্রি সেক্টরের ক্ষেত্রেও। সমস্যা সমাধানে ভারত থেকে ১০ কোটি ডিম আমদানি করে ভারতের বাজার সুবিধা সৃষ্টির জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছি আমরা, পক্ষান্তরে এর মধ্য দিয়ে যে ২০ বছরের বিকশিত আমাদের নিজস্ব একটি শিল্প যে কতটা হতাশায় পড়তে পারে সেই ভাবনা আমাদের নেই।

শাইখ সিরাজ : কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, পরিচালক ও বার্তা প্রধান, চ্যানেল আই
Khoj Khobor